(পঞ্চম খণ্ড)

মিত্র ঘোষ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ

(্িওুঞেছ] ১০ শ্যামাচরণ দে স্ট্রাট, কলকাতা-৭৩

হিমালয় : পঞ্চম খণ্ড প্রথম প্রকাশ, পৌষ ১৩৯৭

প্রচ্ছদপট : কাঞ্চনজঙ্ঘা তিস্তা অঙ্কন : মণি সেন (শিল্পীর কন্যা শ্রীমতী নীলিমা রায়ের সৌজন্যে) বিন্যাস : পূর্ণেন্দু রায়।

[71/18/৬01৬ 9) 91700 1৬1011015| 4 0011500101) ০01 0261080065 01 11100919995. 1১001191100 0) 1৮105 & 010051) 1১101191615 1১৬. 1:00, 10 9119178 01221) 1059 9৯0৫০০0, £0911918-700 073

মিত্র ঘোষ পাব্লিশার্স প্রাঃ লিঃ, ১০ শ্যামাচরণ দে স্ত্রী, কলকাতা-৭০০ ০৭৩ হইতে পি. দত্ত কর্তৃক প্রকাশিত মানসী প্রেস, ৭৩ শিশিয় ভাদুড়ী সরণী, কলকাতা-৭০০ ০০৬ হইতে প্রদীপকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক মুদ্রিত

ভূমিকা : ড: অরুণকুমার বসু [১] অমরতীর্থ অমরনাথ নীল দুর্গম ১৪৯ গঙ্গা-যমুনার দেশে ৩০৫

২৮

ভূমিকা

অরুণকুমার বসু

ভৌগোলিক পরিচয়ে পৃথিবীর পাঁচটি মহাদেশ। অর্থনৈতিক বাণিজ্যিক বিশ্বায়নে হয়তো পৃথিবী কোনো-একদিন এক-মহাদেশে পরিণত হবে। আপাতত মহাদেশ-বিভাজন রাজনৈতিক প্রাকৃতিক দিক থেকে আর সেই বিচারেই পৃথিবীর ষষ্ঠ মহাদেশরূপে চিহিত ঘোষিত হোক হিমালয়। হিমালয়কে এশিয়া ইউরোপের পার্বত্য-বিভাজক রেখা না ধরে স্বতন্ত্র মহাদেশরূপে গ্রহণ করা একটি আবশ্যিক বুদ্ধিগ্রাহ্য প্রস্তাব। এই হিমালয় জয় করার জন্য, আগ্রাসনের জন্য, অধিকারের জন্য, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছে কতকাল কত মানুষের ধারা। হিমালয় তবুও রয়ে গেছে অজিত-অজেয়, অপরাহত মহিমায় সমুন্নত। তার কোলে উপনিঝিষ্ট হয়েছে শতশত বৎসর ধরে কত ধর্ম বর্ণ সম্প্রদায়ের মানুষ জনশ্রুতি আছে যিশু খ্রিষ্ট নাকি হিমালয়ে এসেছিলেন। বৈদিক ধাধিদের তপঃসিদ্ধির লীলাভূমি, বৌদ্ধধর্মের প্রস্থানভূমি, কনফুসিয়াসের প্রচারভূমি, তন্ত্র গুহাভূমি, পৃথিবীর আরও বহু পার্বত্য উপজাতির ধর্মাচরণভূমি হিমালয় কোনো বিশ্বাসের সঙ্গে বিরোধ ঘটায়নি। কোনো অতিথিকে ফিরিয়ে দেয়নি। সমগ্র হিমালয় কোনোদিন কোনো সান্রাজ্যবাদীর করদ রাজ্যে পরিণত হয়নি। এই হিমালয় থেকে উৎসারিত জলধারাই এশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চলকে বারি জুগিয়ে চলেছে। পৃথিবীর বৃহত্তম বনভূমি, উচ্চতম গিরিশূঙ্গ, শীতলতম দীর্ঘতম হিমবাহ, বিপুলতম খনিজসম্পদ নিয়ে অটলমহিমায় সমাসীন এই বিপুল ভূধর অবশ্যই বিশ্বের মহাদেশ, বিশ্বমহাকাব্যের প্রথম পার্থ।

হিমালয়-সাম্রাজ্যের সুদূর উত্তরভাগে কাশ্মীর রাজ্যের ভূসীমান্তে অতি দুরধিগম পার্বত্যগুহা অমরনাথ বংসরে একবার ভক্তসমাগমে দর্শনার্থী কোলাহলে গমগম করে ওঠে। যানবাহনের সুবিধাবৃদ্ধি পথঘাটের "সুব্যবস্থার কারণে পথদুশ্চরতা আজ অনেকটাই কমে গেছে। তবু বর্তমানে অন্যধরনের দুর্গমতা যুক্ত হয়েছে এই তীর্থপথে। তা হল সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের আশঙ্কা। তবু সেই অগমবন্ধুর ভয়ালসুন্দরের প্রতি মানুষের আগ্রহ হ্রাস পায়নি। বছরের পর বছর যাত্রীসংখ্যা অজজ্র বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভ্রমণের সুযোগ- সুবিধা বাড়ছে। কিন্ত তবুও আরও তো কত অজত্রতর যাত্রীর অবস্থা ভ্রমণের অনুকূল নয়। কক্ষে যাদের রুদ্ধ দুয়ার সেইসব গৃহান্তরীণদের কাছে ভ্রমণসাহিত্যই একমাত্র সম্বল। পথ যাঁদের কাছে প্রাচীর-ঘেরা, তীর্থস্থান যাঁদের কাছে নিমন্ত্রণের রাঙা চিঠি মেলে ধরে না, তারাই আসেন প্রমোদকুমার চট্টোপাধ্যায়, প্রবোধকুমার সান্যাল, উমাপ্রসাদ

[২]

মুখোপাধ্যায় বা শঙ্কু মহারাজের কাছে। শফর-সংগঠকদের গাইডবুক এঁরা কেউই প্রস্তুত করেননি। শঙ্কু মহারাজের 'অমরতীর্থ অমরনাথ' প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৮-এ, ১৩৮৫ বঙ্গাব্দে। আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগের সে বই পড়ে এখন কেউ অমরনাথ যাওয়ার ছক তৈরি করবেন না। এই বইতে পার্বত্য দূরত্বের পরিমাপ লেখা হয়েছে মাইলের অঙ্কে, পথের হিসেব পায়ে-চলার শ্রমে। এই বইয়ের সপ্তম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৩৯৪ বঙ্গাব্দে, অর্থাৎ তখনও গ্রন্থটির জনপ্রিয়তা অব্যাহত। ১৯৮৮ সালে অমরনাথ যাত্রার জনপ্রতি যে খরচ এর পরিশিষ্টে দেওয়া হয়েছে, সেই পরিমাণ মুদ্রা সম্বল করে নিশ্চয় এখন কেউ অমরনাথ যাত্রা করেন না। বিস্ময়বিস্ফার হিমালয়ের ভীষণমধুর রূপ যাঁরা স্বচক্ষে দেখেননি, তারাই বারবার এই বইয়ের পৃষ্ঠায় চোখ মেলে ধরবেন। এই গ্রন্থের ১৩৯৫ বঙ্গাব্দের সংস্করণের চতুর্থ প্রচ্ছদে বইটির পরিচিতিরূপে লেখা হয়েছিল : “শঙ্কু মহারাজের সাহিত্যসাধনার সর্বোত্তম সৃষ্টি হিমালয় ভ্রমণকাহিনী। কারণ ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন হিমালয়-প্রেমিক পর্বতারোহী। প্রকৃতপক্ষে হিমালয়ের কথা দিয়েই তিনি তার সাহিত্যসাধনা শুরু করেছেন। “অমরতীর্থ অমরনাথ” লেখকের দ্বাদশ ভ্রমণকাহিনী। মহাতপা ভূগুমুনি বলেছেন, অমরনাথজীর সুধালিঙ্গ দর্শন করলে মানুষ অমরত্ব লাভ করবে আর ওই গুহাতীর্থের নাম হবে অমরনাথ। লেখক সেই সুপ্রাচীন তীর্থের কথা কাহিনীকে নৃতন উপচারে উপহার দিয়েছেন এই 'অমরতীর্থ অমরনাথ' গ্রন্থে। আমাদের বিশ্বাস অমরনাথের উপরে এমন প্রাঞ্জল প্রামাণ্য ভ্রমণকাহিনী ইতিপূর্বে আর প্রকাশিত হয়নি। যাঁরা অমরনাথ গিয়েছেন এবং যাঁরা যাননি, তাদের সবার জন্যই এই গ্রন্থ। শঙ্কু মহারাজের ভ্রমণকাহিনী পাঠ করা আর ভ্রমণ করা একই কথা ।”

প্রকাশক লিখিত এর প্রতিটি বাক্যের সঙ্গে বর্তমান ভূমিকাকার তার কণ্ঠ-সমর্থন ঘোষণা করছেন।

ভারতীয় পর্বতারোহণের প্রায় দ্বাপরযুগে গাড়োয়াল-হিমালয়ের ২১২৬৪ ফিট উচু দুরারোহ দুর্জয় নীলগিরি-শিখরারোহণের রুদ্বশ্বীস কাহিনী “নীল দুর্গম” যুগান্তরে ধারাবাহিক প্রকাশকালে গ্রস্থাকারে প্রকাশের পরে বিপুল পাঠক-সমাদর সমুগ্ধপ্রশংসা অর্জন করেছিল। সে আকর্ষণ সম্ভবত আজও স্তিমিত হয়নি। শুধুই ভ্রমণকথা নয়। এর আষ্ট্েপৃষ্টে আরও পাই ভারতীয় পর্বতারোহণের ইতিকথা, যা নাকি আজও স্বতন্ত্র ্রস্থাকারে বাংলায় সংকলিত হয়নি। রবীন্দ্রনাথ পথের প্রান্তে তীর্থ খোঁজার চেয়ে পথের দুধারে দেবালয় দেখে তাতেই মোহিত হতে চেয়েছিলেন। যথার্থ ভ্রমণসাহিত্যের সংজ্ঞাই বোধহয় তাই। নইলে যাত্রাপথের আনন্দগান বাজবে কেমন করে। বজ্ত্রনাদ যেমন ধ্বনিমাত্র নয়, তার সঙ্গে মনের কাছে তা মেলে ধরে নিশীথের ঘন অন্ধকার, অবিরল বর্ষণ, ভয়ার্ত প্রকৃতি, মূক বনস্পতির ছায়াবৃত স্তব্ধতা; তেমনি নীলগিরি নামটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে একটি গিরিশৃঙ্গই উত্তাসিত হয় না। তৎসহ ভেসে ওঠে গাড়োয়ালের মনোমোহনগহন ভূপ্রকৃতি, বর্ণাঢ্য পার্বত্য জনজীবন, অগণিত শৃঙ্গ কুণ্ড, কত মন্দির গুহা চৈত্য গুস্ফা ঝরণা হিমবাহ পাকদণ্ডি তুষারঝড়, হয়তো বা তুষারমানবের রহস্যময়

[৩] পদশব্দ। এ-সব কিছু ছাপিয়ে এক অলৌকিক অপরূপের সামনে স্তব্ধ হয় মন যার নাম নন্দনকানন। সেই পুষ্পরহস্যের আকর্ষণে বিদেশিনী কুসুমবিজ্ঞানী মার্গারেট লেগী ছুটে গেছিলেন সেখানে, আর ফিরে আসেননি। ফুল্লকুসুমিত নন্দাবতীর মৃদ্গর্ভে শায়িত আছে তার নিথর দেহ উত্ভিদলক্ষ্মীর অস্তঃপুরে।

'গঙ্গাযমুনার দেশে ১৩৭৯ বঙ্গাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয় যখন 'বিগলিত করুণা জাহ্বী যমুনা'-র লেখককে বাঙালি পাঠক নিশ্চিতভাবে চিনে নিয়েছিলেন। তিন দশক যাবত বইটির পাঠক-সমাদর অক্ষুণ্নই আছে, ভ্রমণসাহিত্য হিসেবেই শুধু নয়, একটি অজানা ইতিহাস হওয়ার গৌরবেরও। “বিগলিত করুণা জাহবী যমুনা' তখন কাহিনীচিত্রে রূপায়িত হতে চলেছে। লেখকও চলেছেন সেই চিত্রপরিচালক কলাকুশলী শিল্পীদলের সঙ্গে সেই অকুস্থলে। স্টুডিও-র চত্বরে কৃত্রিম সেট তৈরি করে ভ্রমণকাহিনীর পুরিয়ায় ভেজাল পুরে দেওয়ার চেষ্টা হয়নি সেদিন। ফলে যাত্রাপথের কাহিনীর সঙ্গে চিত্রগ্রহণপর্বের কাহিনী যুক্ত হয়ে কৌতুহলের স্তর পুরুষ্ট হয়ে উঠেছে। চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সে যুগটা ছিল প্রায় সেকেলে। পুরনো যন্ত্রপাতি, ধিশাল ভারী ক্যামেরা, ভারবাহী জেনারেটার, কুলি মালপত্রের বিরাট দল যেন খুন্ধযাত্রায় টলেছে। এই চিত্রগ্রহণ উপলক্ষেই যমুনোত্রী গঙ্গোত্রী মন্দিরে নাকি প্রথম বিদ্যুতের আলো জ্বলেছিল। সমুত্রপৃষ্ঠ থেকে এত উঁচুতে বাংলায় এর আগে কোনো চিত্রগ্রহণ হয়নি, সে তথ্যের এঁতিহাসিক মূল্যও আজ কম ময়।

ভ্রমণসাহিত্য শব্দ-অভিধাটি ব্যবহারজীর্ণ হতে চলেছে ভ্রমণের নামে প্রচারিত বিশেষ এক ধরনের টট্রাভেল-গাইভবুকের কৃপায়। বাঙালির ভ্রমণস্পৃহা প্রবাদবিদিত। আর সেই ভ্রমণার্থীদের পথসংকেত থেকে শুরু করে যাবতীয় যাগ্রাথটিত তথ্য সরবরাহ করাই বিশেষ একশ্রেণীর গ্রন্থের উদ্গেশ্য-বিধেয় হয়ে উঠেছে। ফলে স্কুল বিচারে টুরিস্ট গাইডবুকের সমার্থক হয়ে উঠেছে ভ্রমণসাহিত্য। কিন্তু যাঁরা ভ্রমণের কাগুজে পথসঙ্গী টান না, ঘরে বসে পর্যটকের চোখ দিয়ে না-দেখা না-জানা বিশ্বের কল্পপথিক হয়ে চান, তাদের কাছে ভ্রমণসাহিত্যের আবেদন কখনও ফুরোবে না। প্রমোদকুমার চট্টোপাধ্যায়ের দেখা সেই সন্্যা্সী হিমালয়, অমদাশক্কর রায়ের দেখা সেই ভ্রন্তধাবমান লম্ডন, সৈয়দ মুজতবা আলীর দেখা সেই খোশমেজাজি বিলাসী গ্যারি আজ আর কোথাও নেই। পরিবর্তমান দুমিয়া তাদের চেহারা আকণ্ঠ বদলে দিয়েছে। তবু জলধর সেন থেকে প্রবোধকুমার সাম্যালের ভ্রমণসাহিত্য কি আজ অপাংক্তেয় ছয়ে গেছে?

বাংলা ভ্রমণলেখ সাহিত্য-সাধনায় শঙ্কু মহারাজ মামটি নিজগুণে সন্্াস্ত উচ্চাসন দখল করে নিয়নেছেম। তার ভ্রমণচারিতা আলাপচারিতা তার প্রথম জনপ্রিয় গ্রন্থের মতোই একদিকে ধিগলিত-ধরুণা অল্যদিকে জাহন্বী-মুমা অর্থাং তথ্যে ফটোনিপুণ, তন্বে সত্যসুন্দর়। তায় পরিব্লাজকতা পথেশ্রান্তয়ে মক্-পর্বতৈ নর্গী-সমুদ্্ে প্রসারিত।

[৪]

“বিপুলা” পৃথিবীর কতটুকু জানি এই আর্ধবাক্য অমোঘ সত্য হলেও দীর্ঘদিন দীর্ঘপথশ্রমে কত অজানাকে তিনি জানিয়ে চলেছেন। দেশ-বিদেশ এশিয়া-ইউরোপ ভারত-বাংলাদেশ যেখানেই তার শফর সেখানেই তিনি মধুকর। তার সেই ভিক্ষালব্ধ ধন আবার পাঠককুলের ভোগে লাগে।

তবু এই ভ্রমণবৃত্তান্তের বৃহত্তম অংশ জুড়ে আছে হিমালয়। একথা তার পাঠকমাত্রেরই জানা আছে যে, শঙ্কু মহারাজের হিমালয়-ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তার ভ্রমণবিষয়ক রচনাবলীর মধ্যে সর্বাধিক স্থান দখল করে আছে। তার মোট যোলোটি হিমালয়-ভ্রমণী-র চোদাটি নিয়ে তার হিমালয়-সংকলনের পাঁচটি খণ্ড এযাবত প্রকাশিত। বাংলা সাহিত্যের ভ্রমণবার্তায় হয়তো এটাই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গ্রস্থসংবাদ। পূর্ববর্তী চারটি খণ্ডে হিমালয়ের কোন কোন অঞ্চল আখ্যান স্থান পেয়েছে পাঠকরা তার পরিচয় পেয়েছেন। সদ্য-প্রকাশিত পঞ্চম খণ্ডের অন্তর্ভুক্ত “অমরতীর্থ অমরনাথ” 'নীল দুর্গম" 'াঙ্গা-যমুনার দেশে" পাঠকবর্গের হাতে সমর্পণ করে ভূমিকাকার হিসেবে আমার নিবেদন সমাপ্ত করলাম।

অমরতীর্থ-অমরনাথ

হিমালয় (৫ম)-_-১

অমরতীর্ঘেব অমরযাত্রী ভ্রীকালিদাস রায় গোষ্ঠীপতি শ্রীমতী সুজাতা রায় গোষ্ঠীপতিব স্মৃতিব উদ্দোশে__

তীর্থের দেবতা ডাক না দিলে তীর্থদর্শন হয় না।

সত্যটি জীবনে আমি বার বার প্রত্যক্ষ করেছি। সমস্ত আয়োজন শেষ করার পরেও যাত্রা শুর করতে পারি নি। আবার প্রায় বিনা প্রস্তুতিতে পথে নেমে পড়েছি, তীর্থদর্শন করে নির্বিঘ্বে ঘরে ফিরেছি।

এবারের এই অমরনাথ যাত্রার কথাই ধরা যাক। বাষট্রি সালে কাশ্মীরে বেড়াতে এসেছিলাম প্রায় মাসখানেক কাটিয়েছি ভূস্বর্গে। দিন সাতেক পহেলগায়ে থেকেছি কিন্তু অমরতীর্থঅমরনাথ দর্শন করতে পারি নি।

তারপর থেকে প্রায় প্রতিবছর হিমালয়ে এসেছি। কিন্তু অমৃতময়-অমরনাথে যাওয়া হয় নি আমার। সুযোগ এসেছিল এবারেও মাত্র মাস দুয়েক আগের কথা। আমারই পরামর্শে অমরনাথ যাত্রার আয়োজন হল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এমন একটা বাধা এল যে আমি তাদের সঙ্গী হতে পারলাম না। ভাবলাম অমিত-অমরনাথকে দর্শন করা অদৃষ্টে নেই আমার।

কিন্তু মাত্র দিন দশেক আগে, বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ ফকিরবাবু, কুণ্ডু ট্াভেলস-এর মালিক ফকির কুণ্ডু, ফোন করে বসলেন-_-১২ই আগস্ট অমরনাথ যাত্রা করছি। এবারে ভাদ্র মাসে যাত্রা পড়েছে। পথে বৃষ্টি কম হবে। এমন সুযোগ পাবেন না। চলুন, দর্শন করে আসবেন।

কথায় কথায় সেদিন তীকে বিগত অভিজ্ঞতার কথা বলেছি। বলেছি-__অমিয়- অমরনাথকে দর্শন করা আমার অদৃষ্টে নেই।

গম্ভীর স্বরে ফকিরবাবু বলে উঠেছেন-_এবারে বাবা অমরনাথ ডাক দিয়েছেন আপনাকে

চমকে উঠেছি! আমার মন বলছে__ফকিরবাবু হয়তো ঠিকই বলেছেন। নইলে আমি তো কখনও তার কাছে অনাদি-অমরনাথকে দর্শন করার ইচ্ছা প্রকাশ করি নি। বহুদিন দেখাও হয় নি তার সঙ্গে। তবু তিনি এভাবে হঠাৎ আমাকে অমবনাথ যাত্রায় যাবার আমন্ত্রণ জানাবেন কেন?

অতএব কোন চিন্তা-ভাবনা না করেই ফকিরবাবুকে সেদিন সম্মতি জানিয়ে দিয়েছি।

বাধা কিন্তু এবারেও এসেছে। সম্মতি জানাবার তিনদিন পরে আমার “ফুড পয়জন হল। দু'দিন বাড়িতে বিশ্রাম নিতে বাধ্য হলাম। সবচেয়ে বড় বাধা এল তারপরে, রওনা হবার মাত্র দু'দিন আগে। সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে দেখি গৌতমের খুব জ্বর। সারারাত তার শিয়রে বসে থাকতে হল। গৌতম আমার একমাত্র বংশধর। সুতরাং যথাসাধ্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। জ্বর কমেছে কিন্তু ছেড়ে যায় নি। শেষ পর্যস্ত তাকে শয্যাশায়ী রেখেই রওনা হয়েছি অমরনাথের পথে। কারও নিষেধ শুনি নি। কেন যেন বার বার মনে

হচ্ছে__এবারে বাবা ডাক দিযেছেন আমাকে।

বাধা? হ্যা, তীর্থদেবতা ডাক দিলেও তীর্ঘযাত্রায় বাধা আসতে পারে। তীর্থের দেবতা বাধার ভেতর দিয়ে তীর্থযাত্রীর আন্তরিকতা পরীক্ষা করেন। গৌতমের আকস্মিক অসুখ আমার প্রতি অমরনাথের সেই পরীক্ষা ছাড়া আর কিছুই নয়। এবং এবারে আমাকে কৃতকার্য হতেই হবে।

অমিত-অমরনাথকে অবলম্বন করে যাত্রা আয়োজিত হলেও আমার সহ্যাত্রীরা শুধু অমরনাথ দর্শনের জন্য ঘর ছাড়েন নি। তারা “কুণ্ু ট্র্যাভেলস'এর যাত্রী। তাদের পুণ্যসঞ্চয়ের প্রভূত আয়োজন করেছেন ফকির কুণ্ডু। তাই আমরা কাশী হরিদ্বার ঝষিকেশ অমৃতসর দেখে আজ সকালে জন্মু-তাওয়াই এসেছি। ফেরার পথে সাতদিন শ্রীনগরে থেকে কাশ্মীরের যাবতীয় দ্রষ্টব্যস্থল দেখব। তারপরে জ্বালামুখী দিল্লী হয়ে কলকাতা ফিরব।

কিন্তু আমার কাহিনী অমরতীর্থ অমরনাথ যাত্রা নিয়ে। কাজেই কাশী হরিদ্বার অমৃতসরের কথা থাক, অমরনাথ যাত্রার কথা থেকেই শুরু করা যাক।

আজকের যাত্রা শুরু হয়েছে জন্মু-তাওয়াই রেলস্টেশনের ট্যুরিস্ট প্ল্যাটফর্ম থেকে। যাত্রী বেশি বলে এবারে ফকিরবাবু আর ট্ট্যুরিস্টকোচ" আনেন নি, একখানি “থ্রিটায়ার বগি” এনেছেন। তাহলেও রেলের ভাষায় আমরা ট্যুরিন্ট। অতএব স্টেশন কর্তৃপক্ষ আমাদের বগিখানিও ট্যুরিস্ট প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছেন।

কাশ্মীর ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট স্পট্‌*। জন্মুতাওয়াই রেলস্টেশন কাশ্মীরের প্রধান প্রবেশ তোরণ। তাই কর্তৃপক্ষ এই বিশেষ ট্যুরিস্টু প্ল্যাটফর্মটি নির্মাণ করেছেন।

প্লযাটফর্মটি নির্মিত হয়েছে স্টেশনের শে প্রান্তে, বড় রাস্তার পাশে। বড় রাস্তা থেকে একটি মোটরপথ নিয়ে যাওয়া হয়েছে প্ল্যাটফর্মে। বাস ট্রাক অনায়াসে উঠে যায় প্রশস্ত প্ল্যাটফর্মে ওপরে। ফলে ট্যুরিস্টদের কুলিভাড়া সময় বেঁচে যায়। ভারতের সমস্ত তীর্থ দর্শনীয় স্থানের রেলস্টেশনে এমনি প্ল্যাটফর্ম থাকা উচিত। কিন্তু দুঃখের কথা ভারতের অধিকাংশই বড় বড় রেলস্টেশনে আলাদা ট্যুরিস্ট প্ল্যাটফর্ম পর্যন্ত নেই।

যাক্‌গে, যাত্রার কথায় ফিরে আসা যাক। আজ খুব সকালে আমরা জনম্মু-তাওয়াই এসেছি। কিছুক্ষণ আগে বাস ছেড়েছে স্টেশন থেকে। বাবট্রি সালে যখন প্রথম কাশ্মীর এসেছিলাম, তখন পাঠানকোট ছিল রেলপথের প্রান্তসীমা। সেখান থেকে দু-রকমের সরকারী ট্যুরিন্ট বাস ছাড়ত। একটি একদিনে একটি দেড়দিনে শ্রীনগর পৌছত। একদিনের বাস খুব সকালে পাঠানকোট থেকে রওনা হয়ে রাত দুপুরে শ্রীনগরে যেত। দেড়দিনের বাসযাত্রীদের পথের কোন ডাকবাংলোয় রাত্রিবাস করতে হত।

পাঠানকোট থেকে জন্মু রেলপথে ষাট মাইলের মতো। একে তো রেলগাড়ি এতটা পথ এগিয়ে এসেছে, তার ওপরে এখন পথও অনেক ভাল হয়েছে। ফলে এখন সব 'বাস' একদিনে শ্রীনগর কিংবা পহেলগীঁও যায়। তবে সকাল-সকাল রওনা হওয়া চাই। যেটি আমরা পেরে উঠি নি।

কুগ্জু ট্র্যাভেলস্‌ এবার নাকি শ' আড়াই পুণ্যার্থীকে অমরনাথ দর্শন করাবেন। তাদের মধ্যে মাত্র পঁচাত্তর জন আজ আমরা ফকিরবাবুর সঙ্গে এসেছি। বাকিরা পরে

আসছেন। আমরা যারা আজ এলাম, তারাও কিন্তু একদিনে যাত্রায় যাচ্ছি না। আমি প্রথম দলে, তাই সোজা পহেলগাও চলেছি। যারা দ্বিতীয় দলে যাবেন, তারা চলে গেলেন শ্রীনগর। দিন সাতেক বাদে তারা পহেলগাঁও আসবেন। ওঁদের একখানি বাস, আমাদের দু'খানি।

ফকিরবাবু মিসেস ঝরনা মণ্ডল অর্থাৎ কুণ্ডু ট্র্যাভেল্স-এর কর্তৃপক্ষ রয়েছেন আমাদের বাসে। সুতরাং আমাদের বাস ছেড়েছে সবার শেষে। একে তো অন্য দু'্খানি বাস রওনা করে দিয়ে ফকিরবাবু গাড়িতে উঠেছেন, তার ওপরে আমাদের পায়লট স্টেশন থেকে গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন বাস-ডিপোতে। সেখানে গাড়িকে তেল-জল খাইয়ে নিজে জলখাবার খেয়ে নিয়েছেন।

অবশেষে অমরনাথজীর ফটোর সামনে ধূপ জ্বালিয়ে বাবা অমরনাথের জয়ধ্বনি দিয়ে পায়লট যখন বাস ছেড়েছেন, বেলা তখন দশটা বেজে গিয়েছে।

পথে বাটোটে আমাদের দুপুরের খাবার ব্যবস্থা হয়েছে। সেখানে অন্তত ঘণ্টাখানেক সময় লেগে যাবে। কাজেই রাত দশটার আগে পহেলগাঁও পৌছব বলে মনে হচ্ছে না।

জন্মু শহর ছাড়িয়ে এসেছি। এখনও তেমন চড়াই-উতরাই আরম্ভ হয় নি। উধমপুর পর্স্ত এই রকম চলবে, তারপরে শুরু হবে প্রকৃত পাহাড়ী পথ। উধমপুর বেশ বড় শহর। জন্ম থেকে দূরত্ব ৪২ মাইল উচ্চতা ২৩৪৮ ফুট। তার মানে ৪২ মাইলে আমাদের মাত্র ১৩৪৮ ফুট ওপরে উঠতে হবে। জন্মুর উচ্চতা ১০০০ ফুট। *

এটি একালে সমতল ভারতের সঙ্গে কাশ্মীর উপত্যকায় আসার প্রধান পথ হলেও সেকালের জনপ্রিয় পথ নয়। জগদ্গুরু শঙ্করাচার্য কোন্পথে কাশ্মীর এসেছিলেন জানা নেই আমার, তবে মোগল সন্ত্রাটরা এপথে কাশ্মীর আসতেন না। স্বামী বিবেকানন্দও এপথে অমরনাথ আসেন নি।

স্বামীজী অমরনাথ এসেছিলেন রাওয়ালপিগ্ডি-বারমূলা-শ্রীনগর পথে। পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্ব পযন্ত সেটিই ছিল কাশ্মীরে আসার প্রধান পথ। সেপথে আর কাশ্মীরে আসার অধিকার নেই আমাদের

কেন নেই, সে প্রসঙ্গে না গিয়ে স্বামীজীর কথায় ফিরে আসা যাক। স্বামীজী অমরনাথ এসেছিলেন ১৮৯৮ শ্রীস্টাব্দের জুলাই মাসে। সেটি তার দ্বিতীয়বার কাশ্মীর দর্শন। সেবারে স্বামীজীর সঙ্গে কয়েকজন গুরুভাই, পাশ্চাত্য অভ্যাগত এবং শিষ্য ছিলেন। তাদের মধ্যে ভগিনী নিবেদিতা অন্যতমা।

বাস ছুটে চলেছে। আমি অমৃতময়-অমরনাথ-পথে এগিয়ে চলেছি। প্রায় আশি বছর আগে স্বামীজী অমরনাথ দর্শন করেছিলেন। তিনি তার আগের বছরও শরৎকালে কাশ্মীরে এসেছিলেন। সেবারে লোকমাতা নিবেদিতা তার সঙ্গে ছিলেন না। কিন্তু নিবেদিতার রচনা থেকেই আমরা সেবারের একটি সুন্দর ঘটনা জানতে পারি।

বাসে বসে বসে সেই কথাই ভাবছিলাম। ভাবছিলাম সেই পরমা সুশ্রী বর্ষীয়সী কাশ্মীরী ভদ্রমহিলার কথা। শ্রীনগরের পথে এগিয়ে চলেছেন ভারতপথিক বিবেকানন্দ পথশ্রমে ক্রান্ত তৃক্ডার্ত স্বামীজী পথের পাশে একখানি বাড়ি দেখতে পেলেন।

*অদূর ভবিষ্যতে উধমপুর পর্যন্ত রেলগাড়িতেই যাওয়া যাবে।

দেখলেন বাড়ির সামনে এক সুশ্রী প্রৌটা বসে রয়েছেন। স্বামীজী তার কাছে গিয়ে একগ্লাস জল চাইলেন।

ভদ্রমহিলা সন্সেহে স্বামীজীকে বসতে বললেন। যত্ব সহকারে তাকে জল এনে দিলেন। জল খেয়ে বিশ্রাম করে বিবেকানন্দের ক্লান্তি দূর হল। পরিব্রাজক সন্ন্যাসী আবার উঠে দীড়ালেন। বিদায় বেলায় সেই মহীয়সী মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন- মা, আপনি কোন্‌ ধর্মাবলম্বী?

সগৌরবে জয়োল্লাসিত স্বরে ভদ্রমহিলা উত্তর দিলেন__ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! প্রভুর কৃপায় আমি মুসলমানী।

উত্তর শুনে ভারি খুশী হয়েছিলেন বিবেকানন্দ। তিনি মাঝেমাঝেই ভক্তদের কাছে সেই ভদ্রমহিলার কথা বলতেন। নিবেদিতাকেও বলেছিলেন তার কথা।

পরের বছর অর্থাৎ অমরনাথ দর্শনে যাবার পথেও স্বামীজী সবাইকে নিয়ে সেই ভদ্রমহিলার বাড়িতে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। সেদিন সেই মুসলমান পরিবারের সবাই মিলে স্বামীজী তার সঙ্গীদের প্রিয়জনের মতো অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। *

বাস এগিয়ে চলেছে। ছাড়িয়ে এসেছি উধমপুর। শুরু হয়েছে আঁকাবাঁকা চড়াই পথ। এমনি পথ চলবে আপার মুণ্ডা পর্যস্ত। তার আগে অতিক্রম করব বানিহাল টানেল। পৌছব কাশ্মীর উপত্যকায় ।..

হ্যা, ভূস্বর্গ কাশ্মীরে। অমরলোক-অমরনাথ ভূম্বর্গের অনিন্দ্যসুন্দর মোক্ষক্ষেত্র। আমরা সেই তীর্থযাত্রায় শামিল হয়েছি। কিন্তু যাত্রার কথা পরে হবে। প্রকৃত যাত্রা তো শুরু হবে পরশু সকালে, পহেলগাও থেকে আজ বরং যাত্রীদের কথা হোক। যাত্রী মানে আমার সহ্যাত্রী। যারা এই বাসে আমার সঙ্গে পহেলগাঁও চলেছেন।

প্রথমেই বলতে হবে করুণকৃষ্ণের কথা। কলেজের লেকচারার ডঃ করুণকৃষ্ণ ব্রন্মাচারী। বয়সে যুবক, অবিবাহিত। কিন্তু আচারআচরণে প্রবীণ সাত্্বিক। ত্রি-সন্ধ্যা জপ- তপ করে। অসাধারণ স্মরণশক্তির অধিকারী।

বহুদিন থেকেই তার ইচ্ছে ছিল, একবার আমার সঙ্গে হিমালয়ে আসে। তাই এবারে সে সানন্দে সঙ্গী হয়েছে।

আমার আরেকজন বন্ধুও সঙ্গে চলেছে। তার নাম অসীমকুমার মুখোপাধ্যায় পেশায় ইঞ্জিনিয়ার, নেশা ভ্রমণ। সস্ত্রীক প্রায় সারা পৃথিবী ভ্রমণ করেছে। স্ত্রী শ্রীমতী ইনা ইংরেজীর অধ্যাপিকা সুলেখিকা__স্টেট্সম্যানে নিয়মিত ফিচার লেখে। এবারে অবশ্য সে সঙ্গে আসে নি। ছেলেমেয়েদের স্কুল চলছে, তাই আসতে পারে নি।

ওদের দুটি মেয়ে একটি ছেলে। বড় মেয়ে পিয়া ক্লাস এইটে পড়ে। ইংরেজী কবিতা লিখে 'রোটারি ইন্টারন্যাশনাল চিলড্রেনস কম্পিটিশন” জিতেছে। ভারত উপমহাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি হয়ে তাদের খরচে যুরোপ বেড়িয়ে এসেছে।

ছেলে অশেষ ক্লাস ফাইভ ছোটমেয়ে পাঞ্চালী ক্লাস ওয়ানে পড়ে।

আগেই বলেছি অসীম অতিশয় ভ্রমণপিপাসু। কয়েকবছর আগে সে অমরনাথ

0165 ০01 50118 "21106811095 ৮11) 116 5৮/2]]1 ৬1/121211025'--0১ 515191 11450114.

দর্শন করে গিয়েছে। তবু আবার সঙ্গী হয়েছে আমার।

আমরা পাঁচজন বসেছি সবার পেছনে, বাসের লম্বা সীটটাতে। দুপাশে জানালার ধারে বসেছে ব্রহ্মচারী অসীম আর মাঝখানে আমরা তিনজন-_-ফকিরবাবু, মিসেস মণ্ডল এবং আমি।

আমাদের সামনে ডানদিকের সীটে বসেছেন মিস্টার মিসেস ভট্টাচার্য আর বাঁদিকের সীটে তুলতুল অশোক।

মিস্টার কালিপদ ভট্টাচার্যও ইঞ্জিনিয়ার। মধ্যবয়সী স্বাস্থ্যবান সুপুরুষ। মিসেস কিঞ্চিৎ স্থুলকায়া কিন্তু বেশ চলাফেরা করতে পারেন। ভদ্রমহিলা খুবই গুণী। নানা রকমের সেলাই বোনার কাজ জানেন। তবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি যেমন মজার মানুষ, তেমনি স্লেহশীলা। প্রচুর ফল বিস্কুট চানাচুর লজেন্স আচার ইত্যাদি সঙ্গে নিয়ে বাসে উঠেছেন এবং সমানে বিলিয়ে চলেছেন।

এই বিলোবার ব্যাপারটাতে মিসেস মণ্ডলও পিছিয়ে পড়ছেন না। আমি তার পাশেই বসেছি। সুতরাং সুখে ভ্রমণ করছি।

শ্রীমতী তুলতুল মিস্টার ভট্টাচার্যের ছোট মেয়ে। ওরা তিন ভাই-বোন। দিদি আভার বিয়ে হয়ে গিয়েছে, দিল্লীতে থাকে। দাদা কল্যাণও ইঙ্জিনিয়ার।

তুলতুল সবে কৈশোর অতিক্রম করেছে। আমাদের দলের একমাত্র তরুণী সুস্রী স্মার্ট এবং আধুনিকা। সে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বি.এ. ক্লাসের ছাত্রী। বাংলায় অনার্স নিয়ে পড়ছে। কবিতা লেখে, আবৃত্তি করতে গান গাইতে পারে এর আগে সে আর কখনও কোন দুর্গম তীর্থে যায় নি।

তুলতুলের পাশে বসেছে অশোক সাহাচৌধুরী। অবিবাহিত যুবক। ছোট-খাটো কর্মঠ মানুষ। সর্বদা ফিটফাট থাকে ভ্রমণ করতে খুবই ভালবাসে। কেদার-বদ্রী গঙ্গোত্রী-যমুনোত্রী দর্শন করেছে।

মিস্টার ভট্টাচার্যের সামনের সীটে বসেছে গৌরী সরকারদা। গৌরী আমার পূর্বপরিচিতা। গতবছর সে আমাদের সঙ্গে কেদার-বদ্রী গিয়েছিল। গৌরী দেখতে সুশ্রী স্বাস্থ্যবতী, বয়সে যুবতী, পেশায় শিক্ষয়িত্রী। ধর্মপরায়ণা পরিব্রাজিকা। রেলে উঠে আমাকে পেয়ে সে ভারি খুশি। এবং তখুনি বলে ফেলেছে, “ফকিরবাবুর কাছে ঘোড়াভাড়া জমা দিলেও আপনি যখন যাত্রায় যাচ্ছেন, আমি আর ঘোড়ায় উঠছি নে। আমি আপনার সঙ্গে হেঁটে যাব শঙ্কুদা!

সরকারদাও বলেছেন তিনি হেঁটে যাবেন। অথচ তার মেয়ে-জামাই ছেলেরা বারবার বলে দিয়েছেন ঘোড়া নিতে। কেনই বা বলবেন না, তারা সকলেই কৃতী। তার ওপরে সরকারদা ভাল চাকরি করতেন, এখন অবসর যাপন করছেন। সবচেয়ে বড় কথা, তার বয়স প্রায় পঁয়বন্ট্রি। তিনি আমাদের দলের প্রবীণতম সদস্য।

তাহলেও আমি কিন্তু সরকারদার প্রস্তাব অনুমোদন করেছি। কারণ বয়স হলেও তীর স্বাস্থ্য খুবই ভাল। দীর্ঘদেহী সুপুরুষ। মানুষটিও ভারি অমায়িক। গতবছর তিনি হেঁটে কেদারনাথ গিয়েছিলেন। অতএব আপত্তি করব কেন?

হেঁটে যাবার কথা বলেছেন পরিতোষবাবু এবং মামা বলেছে ভাগনে, অশোক ডাক্তার এবং আরও অনেকে অতএব সেকথা এখন থাক। আর হাটাপথ তো শুরু হবে

পরশু থেকে তখন দেখা যাবে কে হেঁটে যায় আর কে ঘোড়-সওয়ার হয়?

সরকারদার পাশের সারিতে বসেছেন পরিতোষবাবু তীর স্ত্রী! পরিতোষ মুখোপাধ্যায়ের পেশা চাকরি, নেশা তন্ত্রসাধনা। তার পরনে প্যান্ট-শার্ট কিন্তু মাথায় জটা। প্রতি সন্ধ্যায় রুদ্রাক্ষের মালা গলায় দিয়ে ধ্যানে বসেন। তাহলেও ভদ্রলোক বেশ মিশুকে মানুষ

পরিতোষবাবু রোগা কালো কিন্তু তার স্ত্রী বেশ ফর্সা। স্বাস্থ্যটিও মন্দ নয়, তবে একটু খাটো। ভারি শান্ত-শিষ্ট মধুর স্বভাব। তিনিও নিয়মিত সন্ধ্যা-আহিকি করেন। ছেলে-মেয়েদের বাড়িতে রেখে স্বামীর সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছেন। কি করবেন, তীর্ঘয বার নেশা যে বড়ই দুর্জয় নেশা।

পরিতোষবাবুর সামনে বসেছে মামা ভাগনে। মামা বিষুপদ পাল, ভাগনে সুনীল নন্দী। দুজনেই ভাল চাকুরে, দুজনেই অবিবাহিত। মামার বয়স পাঁচের কোঠায়। সুতরাং তার বিয়ের বয়স অতিক্রান্ত। কিন্তু ভাগনে সবে তিনের ঘরে পা দিয়েছে। তার বেলায় সেকথা খাটে না। কিন্তু সে ইতিমধ্যেই রামকৃষ্ণ মিশনের একজন উৎসাহী শিষ্য বলে স্বীকৃতি লাভ করেছে।

মামা কিন্তু হাল ছেড়ে দেয় নি। ভাগনে সুদর্শন শিক্ষিত। ভাল চাকরি করে। তার যৌবন অতিক্রান্ত হয়নি। অতএব ভাগনের সংসারী হওয়া সম্পর্কে মামা খুবই আশাবাদী। সুযোগ পেলেই সে ভাগনের কাছে বিয়ে-না-করার অসুবিধেগুলোর বিষয়ে বিবৃতি দান করে। কিন্তু ভাগনের তাতে কোন চিত্তচাঞ্চল্য হতে দেখি নি এখনও আমাব ধারণা মামা বৃথাই বাক্যব্যয় করে চলেছে। শৈশবে পিতৃহীন ভাগনে মামার কাছে মানুষ হয়েছে, মামার কাছেই আছে, সুতরাং সে মামার মতই হবে।

তবে ভাগনে কিন্তু মামার মতো সৌীন নয়। মামা সব সময় ধবধবে ধুতি-পাঞ্জাবি পরে। তার দাড়িকাটা এবং স্নান প্রসাধন পর্ব দেখার মতো। মানুষটি উদার এবং রসিক। ভাগনেকে ছেলের মতো ভালোবাসে আর সুযোগ পেলেই সবার জন্য খরচ করে।

মামা-ভাগনের পাশের সীটে বসেছে ডাক্তার তার মা। ডাক্তার অসিত মুখোপাধ্যায়, উৎসাহী যুবক। এম.বি.বি.এস. পাস করে সবে ডাক্তারি শুরু করেছে। তার বাবা নেই। ছেলে মায়ের দু-চোখের মণি। তাই দুর্গম যাত্রায় মা পুত্রের সঙ্গী হয়েছেন।

কলকাতা থেকে আমাদের সঙ্গে আরও একজন ডাক্তার এসেছে। নাম দীপক ভৌমিক। জলপাইগুড়ির ছেলে। সেও অসিতের সহপাঠী এবং আর.জি.কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত। তার সাহিত্যপ্তরীতি অসাধারণ। চমৎকার আবৃত্তি করে। দেখতে সুন্দর, স্বাস্থ্যটি ভাল, অমায়িক ব্যবহার। এককথায় হিমালয় পথের আদর্শ সঙ্গী। কিস্তু আমরা তার সঙ্গলাভে বঞ্চিত হলাম। কারণ সে শ্রীনগর যাত্রীদের বাসে চলে গিয়েছে। দ্বিতীয় দলের সঙ্গে অমরনাথ দর্শন করবে।

আমাদের ডাক্তারও সঙ্গী হিসেবে মন্দ নয়। বেশ ভাল ছেলে। ডাক্তারের মা-ও সুন্দর গল্প বলেন। ভারি ধর্মপ্রাণা। আর তাই ব্রহ্মচারী মানে করুণকৃষ্ণের সঙ্গে তার খুবই মনের মিল হয়েছে। গাড়িতে ব্রহ্মচারী তাকে অনেক ধর্মকথা শুনিয়েছে।

ডাক্তারের বা পাশের সীটে বসেছে বাসুদেব অপর্ণা। বাসুদেব মুখোপাধ্যায়

১০

মেদিনীপুরের ব্যবসায়ী বসে যুবক কিন্তু একটু আয়েসী। তবে ভ্রমণ করতে খুবই ভালবাসে। তাই স্ত্রী এবং মেয়েদের বাড়িতে রেখে নিজে অমরনাথ চলেছে। আগামী মাসে নাকি আবার মণিমহেশ যাবে।

বাসুদেবের পাশে বসেছে অপর্ণা শ্রীমতী অপর্ণা অধিকারী কৃষ্ণনগরের মেয়ে। সেখানেই একটি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সংস্কৃত শিক্ষয়িত্রী। আর তাই বাসে উঠবার পরে অসীম তাকে ব্রহ্মচারীর পাশে বসতে বলেছিল। বলেছিল-___জুনিয়র কালিদাস আর জুনিয়র গার্গী, জমবে ভাল। ক্লাস নিতে নিতে পহেলগাঁও পৌছে যাবেন।

অসীমের সে পরামর্শ মানতে পারে নি অপর্ণা। সে বলেছে_তা যে হয়না অসীমদা?

_ কেন? অসীম প্রশ্ন করেছে।

অপর্ণা উত্তর দিয়েছে__উনি অধ্যাপক আর আমি স্কুল মাস্টার। আমি কেমন করে ওঁর পাশে বসব? তার চেয়ে এই রেডিওর দোকানদারের পাশে পাশে থাকি, ভবিষ্যতে বিনে পয়সায় রেডিও সারানো যাবে।

রেডিওর দোকানদার বলায় বাসুদেব কিন্তু রেগে যায় নি, বরং সে বোধ করি খুশিই হয়েছে। কারণ অপর্ণা যেমন হাসি-খুশি, তেমনি ভাল কীর্তন গায়। জমিয়ে রাখতে জুড়ি নেই তার। তাছাড়া সে রেগে যাবেই বা কেন। বাসুদেবের যে সত্যই টি.ভি. এবং রেডিওর দোকান আছে।

আমার চিন্তায় বাধা পড়ে। পাশেব থেকে ফকিরবাবু বলে ওঠেন, “আমরা কৃদ এসে গেলাম। এর পরেই বাটোট।”

তিনি বোধহয় আমাদের একটু আশ্বস্ত করে তুলতে চাইছেন। কারণ বেলা দুটো বেজে গিয়েছে। মিসেস ভট্টাচার্য মিসেস মণ্ডলের ফল-ফলাদি বহুক্ষণ আগে নিঃশেষিত। মুখে কেউ কিছু না বললেও সবারই খুব খিদে পেয়েছে। ফকিরবাবু তাই আশ্বস্ত করলেন_ এর পরেই বাটোট অর্থাৎ আমাদের খাবার জায়গা।

কৃুদ জন্মু-শ্রীনগর পথের তৃতীয় উচ্চতম স্থান। উচ্চতা ৫৭০০ ফুট। আমরা জন্ম থেকে ৬৬ মাইল উধমপুর থেকে ২৪ মাইল এসেছি। এখান থেকে বাটোট মাত্র ১২ মাইল। তাছাড়া উত্রাই পথ। আমরা এবারে নিচে নামতে শুরু করব। বাটোটের উচ্চতা ৫১১৬ ফুট। সুতরাং খাবার জায়গা সত্যি এসে গেল।

কৃদের ভেতর দিয়ে বাস চলেছে। মনে পড়েছে সেই ১৯৬২ সালের কাশ্মীর ভ্রমণের কথা। সেবারে সকালে পাঠানকোট থেকে রওনা হয়ে সন্ধ্যার সময় আমাদের বাস কৃদে পৌছেছিল। আমরা ডাক বাংলোয় রাত্রিবাস করেছিলাম। কৃদ শ্রীম্মকালীন স্বাস্থ্যাবাস। এখানে একটি চমৎকার ঝরনা আছে।

থাক্‌গে, আবার আগের ভাবনায় ফিরে আসা যাক। সহ্যাত্রীদের ভাবনা। অপর্ণার সামনে পায়লটের বাঁদিকে লম্বা সীটটাতে বসেছে কুণ্ডু ট্র্যাভেল্স-এর চারজন কর্মচারী, দুজনের নাম জানি-__-গোপাল মায়া। ফকিরবাবুদের দার্জিলিঙে একটি হোটেল আছে, নাম_ হোটেল কুগডুস। মিসেস মণ্ডল সেটি দেখাশোনা করেন। মায়া সেখানকার কর্মচারী। এখন বর্ষাকাল, দার্জিলিঙের বাজার মন্দা। তাই মিসেস মণ্ডল মায়াকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। ভালই করেছেন। তরুণী মায়া রোগা হলেও খুব খাটতে পারে। আর সে

১১

যেমন সেবাপরায়ণা, তেমনি মিষ্টি স্বভাবের মেয়ে। মায়ার পাশে বসেছে গোপাল-_ফকিরবাবুর বাবা, প্রথম ভারতীয় ট্যুর কন্ডাকটার 'শ্রীপতি কুণ্ডুর হাতে তৈরি গোপাল চক্রবর্তী। তার কথা আমি শুনেছিলাম অনেক দিন, এবারে পরিচয় হল। সত্যি খুশি হয়েছি ওর সঙ্গে পরিচিত হয়ে। বুদ্ধিমান বিচক্ষণ মধুর স্বভাব। অসাধারণ কর্মঠ যুবক। চেহারাটি সুন্দর। এই ক'দিনেই সবাইকে আপন করে নিয়েছে। আমার সহ্যাত্রীদের অনেকেই ইতিপূর্বে তার সঙ্গে কোথাও না কোথাও বেড়াতে গিয়েছেন। তীরা প্রায় সকলেই বয়স নির্বিশেষে তাকে গোপালদা বলে ডাকেন। তাদেরই একজন হঠাৎ বলে উঠলেন, “এটি কি ভাল হচ্ছে গোপালদা £” “কেন মাসিমা?” গোপাল অভিযোগটা বোধহয় বুঝতে পারে নি। মাসিমা বললেন, “সেই সকাল থেকে এই বিকেল পর্যন্ত একেবারে চুপচাপ।” “ও আপনি গান গাইতে বলছেন£” গোপাল যেন নিজের থেকেই ধরা দেয়। মাসিমা খুশি হন। বলেন, “আর যে চুপচাপ বসে থাকতে ভাল লাগছে না।” “আমি গাইতে পারি, তবে একটি শর্তে ।” “কী?” সমস্বরে অনেকেই বলে ওঠেন। “যে ক'খানা শুনতে চান গাইব, কিন্তু তারপরে আপনাদেরও গাইতে হবে।” সবাই নীরব। একটু বাদে তুলতুল বলে, “বেশ, আমরাও গাইব। আপনি আরম্ত করুন।” গোপাল শুরু করে__ “আমাদের যাত্রা হল শুরু এখন, ওগো কর্ণধার। তোমারে করি নমস্কার। এখন বাতাস ছুটুক, তুফান উঠুক, ফিরব না গো আর-_ তোমারে করি নমস্কার আমরা দিয়ে তোমাব জয়ধ্বনি বিপদ বাধা নাহি গণি ওগো কর্ণধার। এখন মাভৈঃ বলি ভাসাই তরী, দাও গো করি পার-_ তোমারে করি নমস্কার ॥” “আমরা নিয়েছি দীড়, তুলেছি পাল, তুমি এখন ধরো গো হাল

ওগো কর্ণধার।

মোদের মরণ বাঁচন ঢেউয়ের নাচন, ভাবনা কী বা তার-_ তোমারে করি নমস্কার।

আমরা সহায় খুঁজে পরের দ্বারে ফিরব না আর বারে বারে ওগো কর্ণধার।

কেবল তুমিই আছ আমরা আছি এই জেনেছি সার-_ তোমারে করি নমস্কার ॥,

১২

দুই

গোরাদা দাঁড়িয়ে রয়েছেন বাংলোর সামনে বাস থামতেই তিনি তাড়াতাড়ি এসে দরজা খুলে দিলেন।

গোরাদা মানে গোরা মিত্র। ফকিরবাবুর বন্ধু। ভবানীপুরের এক বনেদি পরিবারের ছেলে। অকৃতদার। তীর্ঘদর্শন সাধুসঙ্গতেই তার সবচেয়ে বেশি আনন্দ। এবছর কুম্তমেলায় তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছে। কৈশোর বয়স থেকেই তিনি কুম্তমেলায় যাচ্ছেন। আনন্দময়ী মা তাকে খুব স্ত্েহ করেন।

যাত্রার আয়োজন করতে ফকিরবাবুকে সাহায্য করেন গোরাদা। কয়েকজন কর্মচারীকে নিয়ে তিনি তাই গতকাল সোজা চলে এসেছেন বাটোট। আমাদের খাবার ব্যবস্থা করে রেখেছেন।

গাড়ি থেকে নামতেই গোরাদা আমার একখানি হাত ধরলেন। পথ থেকে পাঁচধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসি বাংলোর চত্বরে-_বাটোট ট্যুরিস্ট বাংলো। পথের পাশে একটু উঁচুতে অনেকটা জায়গা জুড়ে বাংলো সামনে সবুজ “লন মাঝে মাঝে মরশুমী ফুলের গাছ। নানা রঙের ফুল ফুটে আছে।

বেশ চকচকে রোদ উঠেছে। আগেই বলেছি বাটোটের উচ্চতা ৫১১৬ ফুট। রোদটা ভারি মিঠে লাগছে। আগের বাসের অধিকাংশ যাত্রীরা তাই বাংলোর বারান্দায় কিংবা ভেতরে না গিয়ে থালা নিয়ে চত্বরেই বসে গিয়েছেন।

হঠাৎ কানে আসে, “দাদা! এখানে চলে আসুন।”

তাকিয়ে দেখি অজিত তার স্ত্রী একটু দূরে বসে খাচ্ছে। পাশে গৌরীদা তার মা, অবিনাশদা বৌদি এবং মিস্টার মিসেস বোস।

কাছে এসে বসতেই অজিত বলে, “দাদা ট্রেনে পাশাপাশি সীটে এলাম আর আমাদের আলাদা বাসে দিয়ে দিলে?”

“না, কি করবেন নয়, বলুন কি করবে ।” অজিত আমাকে প্রায় এক ধমক লাগায়।

তাড়াতাড়ি বলি, “আচ্ছা ঠিক আছে ভাই, এখন থেকে তুমিই বলব তোমাকে ।”

একবার থেমে পুরনো প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বলি, “কি করবে বলো, পঁচাত্তর জন যাত্রী এক ট্রেনে এসেছি, সবাই তো আর এক বাসে যেতে পারব না। একটা দিন বৈ তো নয়, রাতেই দেখা হবে। কাল থেকে তো আবার একসঙ্গে থাকা পথ-চলা।”

“ঠিকই বলেছেন দাদা। কিন্তু বাসে আমাদের বড্ড একা একা লাগছে। ট্রেনে যাদের সঙ্গে পাশাপাশি ছিলাম, তারা প্রায় কেউ নেই। যারা আছেন, তাদের সঙ্গে এখনও পরিচয় হয় নি ভাল করে।”

“তাছাড়া,” অজিত থামতেই মিঃ বোস বলে ওঠেন, “আমরা আবার সাহেব- মেমদের পাল্লায় পড়েছি।”

“সাহেব-মেম!” আমি বিস্মিত। আমাদের সঙ্গে তো যুরোপ বা আমেরিকার কোন যাত্রী নেই। অতএব বোসবাবুর দিকে তাকাই।

হেসে ওঠেন মিসেস বোস। জিজ্ঞেস করেন, “বুঝতে পারলেন না তো?”

১৩

আমি মাথা নাড়ি।

বৌমা মানে অজিতের স্ত্রীও খিলখিল করে হেসে ওঠে। মিসেস বোস হাসি থামিয়ে বলেন, “বাংলোর বারান্দার দিকে তাকান, দেখতে পাবেন তাদের ।”

তাড়াতাড়ি চোখ ফেরাই। দেখি সেই অতি আধুনিক তিনজোড়া যুবক-যুবতী খেতে বসেছে। এবারে বুঝতে পারি ব্যাপারটা। ওরা সবাই বাঙালী। কথাবার্তাও বাংলাতেই বলে, তবে পোশাক, প্রসাধন এবং চাল-চলনে সাহেবীয়ানা প্রকট। ওদের সাহেব-মেম বলা যেতে পারে। কিন্তু সেটা ওদের নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার ট্রেনে তো ওরা কোন গোলমাল করে নি। তাহলে বোসবাবু একথা বলছেন কেন?

বোসবাবুর হয়ে বৌমা জবাব দেয়, “আপনি জানেন দাদা, কুণ্ডু ট্র্যাভেল্স থেকে বলে দিয়েছে বাসে কে কোন্‌ সীটে বসবে?”

“হ্যা, জন্মু-তাওয়াই স্টেশনে প্রত্যেক বাসের ম্যানেজার লিস্ট দেখে বলে দিয়েছে কার কত নম্বর সীট।”

“ওরা তা মানে নি। বাস আসতেই হুড়মুড় করে বাসে উঠে সামনের দিকে নিজেদের ইচ্ছে মতো বসে পড়েছে। পরে তাই নিয়ে ম্যানেজারের সঙ্গে ঝগড়া করেছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পাবার জন্য বাসে যখন আমরা “কোরাস” গাইতে শুরু করলাম, তখন ওরা ভুরু কুঁচকে বসে রইল। ভাবখানা-_-গান গাওয়ার চেয়ে বড় অসভ্যতা সংসারে যেন আর কিছুই নেই। আর তাই ওরা আমাদের সঙ্গে খেতে বসেনি, বারান্দায় বসে খাচ্ছে।”

আমাদের খাবার আসে। আমি অজিতের পাশে বসে পড়ি। ব্রহ্মচারী অসীম আমার পাশে বসে। আমরা খেতে শুরু করি।

অবিনাশদা অজিতদের খাওয়া হয়ে যায়। ওরা আমাদের আগে এসেছে। ওদের দু'খানি “বাস'ই আমাদের আগে ছাড়বে। কিন্তু অজিতের ইচ্ছে সে আমাদের বাসে যায়। বলে, “ফকিরবাবুকে গিয়ে বলি, তিনি আর মিসেস মণ্ডল আমাদের সীটে চলে যান, আমরা দু-জন আপনাদের বাসে যাই।”

ফকিরবাবু হয়তো প্রস্তাবটা মেনে নেবেন, কিন্তু অজিতের বাস বদলটা অনেকের কাছে সমালোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দীড়াবে। যাত্রার শুরুতেই এমনটি হওয়া উচিত নয়। তাই বলি, “আর মাত্র ছ-সাত ঘণ্টার ব্যাপার, তারপরেই তো আবার দেখা হচ্ছে। যাত্রার সময় একসঙ্গে চলা যাবে। আজ বরং আর কোন “চেঞ্জ' করো না।

অজিত প্রতিবাদ করে না। তবে সে চুপ করে থাকে বুঝতে পারছি কথাটা তার ঠিক মনের মতো হয়নি।

আমি নীরবে খেতে থাকি।

ওদের বাসের ম্যানেজাররা বাঁশি বাজাচ্ছে। তার মানে এখুনি বাস ছাড়বে। অজিত বৌমা উঠে দীঁড়ায়। বোসবাবুরা আগে উঠেছিলেন।

“আসি তাহলে, আবার দেখা হবে।” বোসবাবু বলেন।

আমি মাথা নাড়ি।

বোসবাবু আবার বলেন, “একটা কথা বলা হয় নি আপনাকে ।”

“বেশ তো বলুন।” আমি বলি।

১৪

একটু ভেবে নিয়ে বোসবাবু বলেন, “আমার হিমালয়স্ত্রীতির মূলে কিন্তু আপনি। আপনার বই পড়েই আমি প্রথম হিমালয় দর্শন করেছি। তাই গাড়িতে উঠে যখন জানতে পারলাম, আপনি আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেন, তখুনি ঠিক করলাম, আপনার সঙ্গেই বাবা অমরনাথকে দর্শন করব। নইলে আমরা ছিলাম দ্বিতীয় দলে, আজ আমাদের শ্রীনগর চলে যাবার কথা। ফকিরবাবুকে বলে দল বদল করলাম। অথচ দুর্ভাগ্য দেখুন, আপনি রইলেন ভিন্ন বাসে।”

“একে দুর্ভাগ্য বলে ভাবছেন কেন?” সহাস্যে প্রতিবাদ করি। বলি, “আমরা তো একসঙ্গেই বাবা অমরনাথকে দর্শন করব।”

“অগত্যা!” হাসতে হাসতে মিসেস বোস মন্তব্য করেন।

ওদের বাস ছেড়ে দেয়। আমরা হাত নেড়ে বিদায় জানাই। আমাদের বাস ছাড়তে দেরি আছে এখনও। এই অবসরে বরং বাটোটের পথে একটু পায়চারি করে নেওয়া যাক। আমি অসীম বাংলোর চত্বর থেকে নেমে আসি পথে। ব্রহ্মচারী অসিতের মায়ের সঙ্গে শাস্ত্রালাচনা করছে। সুতরাং তাকে “ডিস্টার্ব” করা উচিত হবে না।

পীচঢালা মসৃণ প্রশস্ত পথ। জায়গাটি বেশ নির্জন। পথের পাশে সারি সারি গাছ__চমতকার ছায়া বিছিয়েছে। কিন্তু ক্লান্ত পথিক নেই বললেই চলে। লোকালয় কিংবা দৌকানপাট নেই যে। দুজন মহিলা কেবল কিছু আপেল নিয়ে বসেছেন। মোটেই ভাল আপেল নয়। কিন্তু আমার সহ্যাত্রীরা যে কাশ্মীর ভ্রমণে এসে প্রথম আপেল কেনার সুযোগ পেয়েছেন। সুতরাং তারা ভরা পেটে আপেল খাচ্ছেন।

চন্দ্রভাগার তীরে বাটোট একটি স্বাস্থ্যকর স্থান। ডরমিটারি, এবং বাংলো এখানকার প্রধান আশ্রয়স্থল। এখান থেকে চন্দ্রভাগার তীর দিয়ে পথ চলে গিয়েছে ভাদরওয়া কিশ্তোয়ার।

বাংলোয় ফিরে দেখি, বাস ছাড়তে দেরি আছে। ফকিরবাবুর খাওয়া হয় নি এখনও খাবেন কেমন করে? তার যে অনেক কাজ! কাল একদল যাত্রী আসছেন। দিন- চারেক বাদে আসবেন আরেকদল। তারাও পহেলগাঁও এবং শ্রীনগরের পথে এখানেই লাঞ্চ করবেন। ফকিরবাবুকে সব ব্যবস্থা করে যেতে হবে। অতএব তিনি গোরাদার সঙ্গে কনফারেন্স করছেন।

কন্ফারেন্স শেষ হয়। ফকিরবাবু খেতে বসেন। গোরাদাও খান নি। কিন্তু তিনি বসবেন সবার শেষে। তিনি যে আমাদের হোস্টু। গৃহস্বামী তো নিমন্ত্রিতদের খাবার পরেই খেতে বসেন।

খাবার জন্য নয়, গোরাদারও একই আপসোস- একসঙ্গে কাশ্মীর এসেও আমার সঙ্গে অমরনাথ দর্শন করতে পারলেন না।

মনটা খারাপ হয়ে যায়। এবারে আমার যাত্রায় আসার পেছনে তারও কিছু অবদান রয়েছে। কুণ্ু-ট্র্যাভেল্স-এর অফিস থেকে তিনি আমাকে প্রায়ই ফোন করতেন। রওনা হবার আগের দিন যখন গৌতমের অসুখের কথা জানালাম তখন গোরাদা বলেছিলেন-_যাঁর যাত্রায় যাচ্ছেন, তিনিই আপনার ছেলেকে দেখবেন। আপনি চলুন। কথাটা সেদিন বড় ভাল লেগেছিল।

ফকিরবাবু ভূত্রসা দেন, “একসঙ্গে যাত্রায় না গেলেও যাত্রাপথে দেখা হবে

১৫

আপনাদের আর আপনারা একই সঙ্গে শ্রীনগরে থাকবেন এবং কলকাতায় ফিরবেন।”

“অর্থাৎ দুধের সাধ ঘোল দিয়ে মেটাতে হবে, এই তো!” গোরাদা বলে উঠলেন।

গোরাদা দাড়িয়ে রয়েছেন বাংলোর সামনে। দাঁড়িয়ে দীড়িয়ে হাত নাড়ছেন। আমরা বাসে বসে হাত নাড়ছি। বাস চলল এগিয়ে, গোরাদা গেলেন হারিয়ে।

জন্মুর পরে এতক্ষণ আমরা উত্তর-পূর্বে এসেছি। বাটোট থেকে পথের দিক পরিবর্তন ঘটল। এখন আমরা সোজা উত্তরে যাব। এইভাবে এগোবো বানিহাল পর্যস্ত। বানিহাল বাটোট থেকে ৪০ মাইল

বানিহালের উচ্চতা ৫৫৮০ ফুট। তার মানে বানিহাল বাটোটের চেয়ে প্রায় পাঁচশ' ফুট বেশি উচু।

তাহলে এখন কিন্তু আমরা নেমে চলেছি। কৃদের পর থেকে যে উৎত্রাই শুরু হয়েছে, তা শেষ হয় নি এখনও, বরং বেড়েছে।

বানিহাল নয়, আমরা এখন রামবান চলেছি। রামবান বাটোট থেকে ১৭ মাইল। রামবানের উচ্চতা ২২৫০ ফুট। তার মানে মাত্র ১৭ মাইলে আমাদের তিন হাজার তিনশ তিরিশ ফুট নেমে যেতে হবে। রামবানের পর থেকে শুরু হবে খাড়া চড়াই।

বাস এগিয়ে চলেছে। আমরা এগিয়ে চলেছি অমরতীর্থ-অমরনাথ পথে। আগামীকাল এসময় থাকব পহেলগীও। পরশু চন্দনবাড়ির পথে পদচারণা করছি। প্রায় দশমাস পরে আবার হিমালয়ের পথে। ভাবতেও ভাল লাগছে।

কিন্তু ভাবনা থামাতে হল। পাশের থেকে ফকিরবাবু প্রশ্ন করেন, “আচ্ছা, অমরনাথ যাত্রার ওপরে ক'খানা বাংলা বই আছে?”

বিপদে পড়ে যাই। আমি সাহিত্যিক কিংবা সাহিত্য-সমালোচক নই। চট করে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া খুবই কঠিন আমার পক্ষে। তবু একটু ভেবে নিয়ে বলি, “যতদূর মনে পড়ছে শুধু অমরনাথ যাত্রা নিয়ে খানতিনেক বাংলা বই পড়েছি।”

“আরেকখানি হবে আশা করছি?” মাঝখান থেকে মিসেস মগুল প্রশ্ন করে বসেন।

মৃদু হেসে বলি, “এখুনি বলা শক্ত। তবে ভাল লাগলে লিখব, ভেবেছি।”

“তাহলে লিখতে হবে।” মিসেস মগুলের কণ্ঠস্বরে গভীর আত্মপ্রত্যয়। “এপথ আপনার ভাল লাগবেই ।”

কোন প্রতিবাদ করি না। চুপ করে থাকি।

ফকিরবাবু আবার জিজ্ঞেস করেন, “শুধু অমরনাথের ওপরে কি কি বই আছে।”

“দেবপ্রসাদ দাশগুপ্তের “একই আকাশ ভুবন জুড়ে” শঙ্করপ্রসাদ রায়ের “তুষারতীর্থ অমরনাথ' এবং ছ্বিজেশ ভট্টাচার্যের অমরনাথের পথে পথে।' তবে আরও কয়েকখানি বাংলা বইতে আমরা অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে অমরনাথ যাত্রার বিশদ বিবরণ পাই।”

“যেমন?” এবারে মিসেস মগুল প্রন্ন করেন।

উত্তর দিই, “ভগিনী নিবেদিতার বইখানি, বাংলা অনুবাদে স্বামীজীর অমরনাথ দর্শনের কথা আছে। * আমরা অমরনাথের কথা পাই ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত বিশ্বকোষ প্রথমভাগে, স্বামী অভেদানন্দের “কাশ্মীর তিব্বতে', প্রবোধকুমার সান্যালের “দেবাতাত্মা

* 'স্বামীজীর সহিত হিমালয়ে।

৯৬

হিমালয়ে” স্বামী দিব্যাত্মানন্দের 'পুণ্যতীর্থ ভারতে” এবং 'রম্যাণিবীক্ষে।”

“এর মধ্যে কার বর্ণনাটি আপনার সবচেয়ে ভাল লেগেছে?”

“প্রবোধদা স্বামী অভেদানন্দের বর্ণনা ।”

“প্রবোধবাবুর বই আমি পড়েছি, আপনি অভেদানন্দের কথা বলুন।”

একটু ভেবে নিয়ে বলতে থাকি, “স্বামী অভেদানন্দজী ১৯২১ সালের শেষ দিকে আমেরিকা থেকে বেলুড়ে ফিরে আসেন। পরের বছর জুলাই মাসেই তিনি হিমালয় ভ্রমণে বের হন এবং কাশ্মীর লাদাখ তিব্বত ভ্রমণ করে ১২ই ডিসেম্বর বেলুড়ে ফিরে যান।”

“তার মানে তিনি সেবারে এক নাগাড়ে পাঁচ মাস হিমালয়ে ঘুরেছেন?”

“হ্যা ভৈরব চৈতন্য নামে জনৈক ব্রক্মচারী সেই পদপরিক্রমায় তার সঙ্গে ছিলেন। তিনিই অভেদানন্দের ডায়েরি অন্যান্য গ্রন্থের সাহায্যে বইখানির প্রথম পাগ্জুলিপি প্রণয়ন করেন। ১৯২৭ শ্রীস্টাব্দের মে মাস থেকে শ্রীরামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠ-এর মুখপত্র “বিশ্ববাণী'তে ভ্রমণকাহিনীটি ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়। ১৯৪৩ সালে অভেদানন্দ প্রকাশিত কাহিনীটি সংশোধন করে পরিব্রাজক স্বামী অভেদানন্দ' নামে পুস্তক আকারে মুদ্রিত করেন। ২৩ বছর বাদে “কাশ্মীর তিব্বতে' নাম দিয়ে বইখানির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। এই বইখানি হিমালয়ের ওপরে রচিত বাংলা ভ্রমণ সাহিত্যের একখানি অমূল্য সম্পদ ।'

আর কেউ কোন প্রশ্ন করে না। অতএব বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই। রামবানের রাস্তা দিয়ে বাস চলছে। রামবান বেশ বড় জায়গা ডাকবাংলো আছে।

আমাদের সকলের গায়েই গরম পোশাক অথচ রামবানের উচ্চতা মোটে ২২৫০ ফুট। ফলে বেশ গরম লাগছে।

কিন্ত সে কথা প্রথম বলে তুলতুল। সে গা থেকে কোট খুলে ফেলে বলে ওঠে, “বড্ড গরম লাগছে।”

“তাহলেও কোটটা গায়ে দিয়ে রাখো।” মিসেস মণ্ডল তুলতুলকে সাবধান করেন। বলেন, “এখুনি বাস আবার ওপরে উঠতে শুরু করবে, তখন ঠাণ্ডা লেগে যাবে।”

তুলতুল তাড়াতাড়ি কোট গায়ে দেয়।

মিসেস মণ্ডল ঠিকই বলেছেন। রামবান পথের নিম্নতম স্থান। এখন আমরা বানিহালের দিকে চলেছি। বানিহাল ৫৮৮০ ফুট। রামবান থেকে বানিহাল মাত্র ২৩ মাইল। তার মানে ২৩ মাইলে ৩৬৩০ ফুট ওপরে উঠতে হবে। শুধু তাই নয়, তারপরেও উঠতে হবে ওপরে। পৌঁছব শ্রীনগর বাসপথের উচ্চতম স্থান আপার-মুণ্ডায়। আপার-মুণ্ডা ৭২২৪ ফুট উচু।

“আচ্ছা, স্বামী অভেদানন্দ যখন অমরনাথে এসেছিলেন, তখনও কি পহেলগাঁও থেকেই মূলযাত্রা আরম্ভ হত?” মিসেস মণ্ডল আবার আমাকে পুরনো প্রসঙ্গে ফিরিয়ে আনতে চান।

ফিরে আসার দোষ কি? এখনও দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হবে। অতএব চুপচাপ বসে না থেকে সেকালের যাত্রা সম্পর্কে আলোচনা করা যা" না, সময়টা সুন্দর কেটে যাবে। সুতরাং বলি, “অমরনাথজীর ছড়ি নিয়ে যে তীর্ঘযাত্রা, তা সেকালের মতো একালেও

হিমালয় (৫ম)__২ ১৭

প্রীনগর থেকে শুরু হয়। তবে একালে যাত্রা বলতে আমরা যা বুঝি, তা প্রকৃতপক্ষে পহেলগাঁও থেকেই আরম্ভ হয়।”

“হ্যা, হ্যা, ঠিকই বলেছেন। ছড়ি তো থাকে শ্রীনগরে দশনামী আখড়াতে।” কথাটা মনে পড়ে মিসেস মগুলের। তিনি যে প্রায় প্রতিবার যাত্রায় আসেন। মিসেস বলেন, “যাক্গে, স্বামী অভেদানন্দজী কিভাবে যাত্রায় এসেছিলেন, তাই বলুন।”

বলতে থাকি, “অভেদানন্দজী একখানি সরকারি মোটরে চড়ে ২রা অগাস্ট শ্রীনগর থেকে পহেলগীও যাত্রা করেছিলেন। আগেই দু'খানি সরকারি টাঙ্গায় করে তার মালপত্র পহেলগাঁও রওনা করে দেওয়া হয়েছিল।”

“শ্রীনগর থেকে পহেলগাঁও মোটরপথে ৬০ মাইল। এখন এই পথটুকু যেতে যাত্রীদের মাত্র দু-তিন ঘণ্টা সময় লাগে। কিন্তু তখন দিন তিনেক সময় লাগত। অথচ তখনও আইশমোকাম অর্থাৎ শ্রীনগর থেকে ৪০ মাইল মোটরপথ তৈরি হয়ে গিয়েছিল।”

“তাহলে অত সময় লাগত কেন?”

“কারণ তখনকার মোটরপথও ছিল ভয়ঙ্কর এবং দুর্গম। তাই খুব আস্তে আস্তে গাড়ি চালাতে হত।”

“তাছাড়া তখন তো এত শক্তিশালী মোটরগাড়িও ছিল না।” ফকিরবাবু মিসেস মণগ্ডলকে মনে করিয়ে দেন।

মিসেস মাথা নাড়েন। তারপরে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, “তখনও কি সরকার থেকে যাত্রার ব্যবস্থা করা হত?”

“হ্যা, তখনও কাশ্মীর রাজ-সরকারের ধর্মার্থ বিভাগ ছিল। তারাই যাত্রার সব ব্যবস্থা করতেন। প্রতিবছর রাজভাণগ্ার থেকে তাদের হাতে বারো হাজার করে টাকা দেওয়া হত। তারা সেই টাকা দিয়ে রাস্তা সেতু তৈরি করতেন, দরিদ্র যাত্রী সাধুদের খাবার কম্বল দান করতেন। তাদের স্বেচ্ছাসেবকরা যাত্রীদের দুধ কাঠ কুলি ঘোড়া যোগাড় করে দিতেন! ছোট একটি বাজারও যাত্রার সঙ্গে যেত। সেবারে অর্থাৎ ১৯২২ সালে প্রায় পাঁচশ যাত্রী যাত্রায় গিয়েছিলেন।”

“মোটে পাঁচশ!” মিসেস মণ্ডল বিস্মিতা। বলেন, “এবারে তো অনুমান করা হচ্ছে, শুধু পূর্ণিমার যাত্রাতেই পঁচিশ হাজার যাত্রী হবে।”

“খুবই স্বাভাবিক ।” মাঝখান থেকে অসীম বলে ওঠে, “দেশ এগিয়ে চলেছে।”

প্রবল হাস্যরোল।

হাসি থামলে আবার বলতে শুরু করি, “শ্রীনগর থেকে আইশমোকাম পর্যস্ত রাস্তা কিন্ত বেশ চওড়া ছিল। তবে কাঁচা রাস্তা, বৃষ্টি পড়লেই অগম্য হয়ে উঠত।

“আইশমোকাম জায়গাটি বেশ বড় ছিল। অভেদানন্দজীর প্রায় পচিশ বছর আগে স্বামীজী অমরনাথ এসেছিলেন। তখনও আইশমোকাম বেশ বড় জায়গা। স্বামীজী সদলবলে রাত্রিবাস করেছিলেন সেখানে।

“অভেদানন্দজী আইশমোকামে মোটর ছেড়ে দিয়ে ঝাম্পান বা ডাগ্ডিতে চড়ে পহেলগাঁও গিয়েছিলেন। আইশমোকাম থেকে পহেলগাও ১২ মাইল। তখন সেপথে মোটর চলতে পারত না, তবে মোটরপথ তৈরি হচ্ছিল। অভেদানন্দ সকালে

৯৮

আইশমোকাম থেকে রওনা হয়ে সন্ধ্যার সময় পহেলগাঁও পৌছেছিলেন। অর্থাৎ শ্রীনগর থেকে মোটরে ঝাম্পানে ৬০ মাইল পথ যেতে তার তিনদিন লেগেছিল...”

তুলতুলের কথায় কথা থামিয়ে তাড়াতাড়ি সামনে তাকাই-_বানিহাল গিরিবর্ত। সত্যি সুন্দর।

কিছুক্ষণ আগে সন্ধে হয়েছে। আধার নেমে এসেছে পথ আর পাহাড়ের গায়ে, বন আর নদীর বুকে। বাসের আলো ছাড়া আর কোথাও কোন আলে। ছিল না। আঁধারের যবনিকা ভেদ করে বাস এগিয়ে চলেছিল।

প্রায় ছ'হাজার ফুট উচু দিয়ে বাস চলেছে। শীত শীত করছিল বলে বাসের জানলা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কেউ চাদর মুড়ি দিয়ে গল্প করছিলাম আর কেউ বা ঝিমুচ্ছিলেন। শুধু তুলতুল বোধহয় তাকিয়েছিল সামনের উইন্ডস্কিনের ভেতর দিয়ে, তাই সে প্রথম দেখতে পেয়েছে!

দেখতে পেয়েছে আলোর সুড়ঙ্গ একটি নয়, পাশাপাশি দুটি সুড়ঙ্গ__বানিহাল গিরিবর্ত্ু। ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে। আমরা অপলক নয়নে তাকিয়ে থাকি। সোজা হয়ে বসেছেন। আমরা যারা গল্প করছিলাম, তারা নীরব হয়েছি। নীরবে আলোর গুহাদুটিকে দেখছি।

গতবার দিনের আলোয় দেখেছিলাম এই বানিহাল নেহেরু টানেল। কিন্তু তখন এত ভাল লাগে নি। আজ রাতের আধারে দেখলাম তার প্রকৃত রূপ। অবশ্য এরূপ আলোর রূপ- বৈদ্যুতিক আলোর। ভাগ্যিস লোড-শেডিং, হয়নি।

১৯৫৬ সালে এই টানেল নির্মিত হয়েছে, তার আগে ৯০০০ ফুট উঁচু বানিহাল গিরিবর্তের ওপর দিয়ে কাশ্মীরে আসতে হত। শীতকালে তুষারঝড় তুষারপাতের জন্য সে পথ হয়ে উঠত অগম্য। “বানিহাল' শব্দের অর্থ তুষারঝড়। শীতের চারমাস গিরিবর্তে তুষারঝড় লেগেই থাকে ফলে তখন কাশ্মীর উপত্যকা লাদাখের সঙ্গে অবশিষ্ট ভারতের কোন যোগাযোগ থাকত না। এই টানেল তৈরি হবার পর থেকে সেই অসুবিধে দূর হয়েছে। এখন কাশ্মীর আমাদের নিকটতর।

টানেলের ভেতরে সারি সারি আলো জ্বলছে। একপাশে পথচারীদের জন্য ফুটপাত। পাশে নর্দমা, কারণ গুহার গা বেয়ে অবিরত জল চুইয়ে পড়ছে। আধুনিক স্থাপত্যশিল্পের একটি অনবদ্য অবদান এই টানেল। সহযাত্রীরা তাই মুগ্ধ নেত্রে আলোর সুড়ঙ্গ দেখছেন।

পেরিয়ে এলাম বানিহাল টানেল, পৌঁছলাম কাশ্মীর উপত্যকায়। কিন্তু ভূম্বর্গের স্বর্গীয় রূপের সামান্যই দেখতে পাচ্ছি কাচের জানলার ভেতর দিয়ে। শুধু বলতে পারি মেটে জোছনা তাকে মোহময়ী করে তুলেছে।

তাছাড়া আমার অধিকাংশ সহ্যাত্রী বাসযাত্রার ধকলে রীতিমত ক্লান্ত। বানিহাল ছাড়াবার পরেই আবার তারা সীটের ওপর মাথা এলিয়ে দিয়েছেন, চোখ বুজে তন্দ্রার আরাধনায় মনোনিবেশ করেছেন।

আমার হাসি পাচ্ছে, নিজেদের শারীরিক শক্তিহীনতার কথা ভেবে হাসি পাচ্ছে।

৯৯

বিজ্ঞান আমাদের কি রকম শ্রমবিমুখ করে তুলেছে! আর তাই প্রকৃতির প্রতি আমাদের মমত্ববোধ হ্রাস পেয়েছে, বৈচিত্রের প্রতি আমাদের আগ্রহ গিয়েছে কমে।

জম্মু থেকে ডিলাক্স বাসে চড়ে এই পথটুকু আসতেই আমরা শ্রান্ত হয়ে পড়েছি! আর সেকালে, বিশেষ করে মোগল যুগে £ সম্রাটরা তো আগ্রা কিংবা দিল্লী থেকে হাতি চড়ে নিয়মিত কাশ্মীরে আসতেন।

কাশ্মীরের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে সম্রাট আকবর ১৫৮৬ সবীস্টান্দে কাশ্মীর অধিকার করেন। জাহাঙ্গীরের প্রিয়তম স্থান ছিল কাশ্মীর তিনি বার বার কাশ্মীরে এসেছেন। এই কাশ্মীর থেকে ফেরার পথেই ১৬২৭ শ্বীস্টাব্দে তিনি দেহরক্ষা করেন। এখানে এসেছেন শাজাহান। তাবাই নির্মাণ করেছেন মোগল উদ্যান_ চশমা শাহী, নিশাত বাগ, শালিমার বাগ নাসীম বাগ। তৈরি করেছেন অচ্ছাবল ভেরীনাগ। প্রকৃতিকে কতখানি ভালবাসলে অত কষ্ট করে এত দূরে আসা যায়ঃ সত্যই তাদের প্রকৃতিপ্রেম অতুলনীয়।

যাকগে, যেকথা ভাবছিলাম। গতবার বানিহাল গিরিবর্্থ পেরিয়ে এপারে এসে আমরা বাস থামিয়েছিলাম। দিনের আলোয় প্রথম ভূত্বর্গকে দেখেছিলাম। আমি মুগ্ধ আবেশে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়েছিলাম প্রকৃতির অপরূপ লীলানিকেতনের দিকে দুদিকে দিগন্তের কাছে পাহাড়ের আঁকার্বাকা ধূসর রেখা। নীল আকাশের বুকে সাদা মেঘের লুকোচুরি খেলা আর মাটিতে... মাটিতে সবুজ, শুধু সবুজ-সমতল। আমাদের পথটি সেই সবুজের জগতে গিয়ে মিলেমিশে একাকার। সবুজ উপত্যকার বুক চিরে বয়ে যাচ্ছে একটি রূপোলী নদী। অনেক দূর গিয়ে সে-ও সবুজের মাঝে গিয়েছে হারিয়ে।

আজ ভূতম্বর্গের সেই অপরূপ রূপ আমি দেখতে পেলাম না দু'চোখ ভরে। রাতের আঁধার আজ আড়াল করে রেখেছে তাকে।

তাই পায়লট গাড়ি থামায় নি। গাড়ি এগিয়ে চলেছে। আরও ২৪ মাইল এগিয়ে আমরা পোৌঁছব ভেরীনাগ পথের সঙ্গমে। সেখান থেকে কাশ্মীরের প্রাণধারা ঝিলমের উৎস ভেরীনাগ মাত্র মাইল। যাতায়াতের পথে সব সরকারি ট্যুরিস্ট বাস যাত্রীদের ভেরীনাগ নিয়ে যায়!

“ফকিরকাকু, আমরা কি তাহলে ভেরীনাগ দেখছি না?” তুলতুল হঠাৎ প্রশ্ন করে। সে-ও বোধকরি আমার মতই ভেরীনাগের কথা ভাবছিল বসে বসে। আমি তো তবু একবার দেখেছি সেই মনোরম স্থান। কিন্তু তুলতুল এই প্রথম কাশ্মীরে এল।

ফকিরবাবু আশ্বস্ত করেন তাকে বলেন, “দেখব বৈকি! তবে আজ নয় আজ যে রাত হয়ে গেল। ফেরার দিন তোমাদের ভেরীনাগ দেখিয়ে দেব।”

“সেদিন আবার রাত হবে না তো?” তুলতুল নিশ্চিন্ত হতে চাইছে।

এবারে মিসেস মণ্ডল জবাব দেন। মৃদু হেসে বলেন, “সেদিন তো