জুদুরেৰ গিয়ামী

জ্রীক্গমথনাথ ঘোষ

বি, এন, ঘোষ

কলিকাতা-_-৩১

নব্পরিকল্পিত ংস্করণ

১৩৪১

পি, থোধ কর্তৃক বি, এন, ঘোষ, কলিকাতা _-৩১ হুইতে প্রকাশিত গু শ্রীরমেশ বন্ধ কর্তৃক মেটকাফ প্রেস ৬, রাজন লেন, কলিকাতা, হইতে মুজিত।

উৎসর্গ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কৰি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্রীচরণে-_

এই লেখকের লেখা-__ বাক শ্বোত জটিলতা! সর্ধবংসহ! ছায়াসঙ্জিনী প্রহরী ৰাশীওল। মহানদী অহল্যার ন্ব্গ পরপুর্ব্বা মন বিনিময় দিগন্তের ডাক আলোক তীর্থ (যন্ত্রস্থ ) উত্তর বাহিনী ,* )

স্দুলন্লেল শিল্লাত্দী

প্রথম পরিচ্ছেদ

মা, প্রতিবেশী বামুনমাসী বৌদিদিকে নিয়ে বন্ধু রওনা হবে তীর্থ- দর্শনে পূর্বোক্ত দু'জনে বৃদ্ধা, প্রায় ষাটের কাছাকাছি বয়স, কেবল বৌদিদি অল্পবয়সী, তরুণী। জঙ্গী হিসেবে এঁরা কেউই সুবিধার নন; তার ওপর মায়ের শরীর কিছু ভারী, বাতের ব্যামো আছে ; আর মাসীমার দেহ বয়সের তুলনায় মজবুত হ'লে কি হবে, ম্যালেরিয়ার সঙ্গে তাঁর অচ্ছেছয বন্ধুত্ব তীর্থ হ'লো৷ বাংলার এক নিভৃত পল্লীতে-_কে জানে সেখানকার জল-হাওয়৷ কেমন, ভাক্তার-বগ্যি পাওয়। যায় কিনা !

একলা যেতে তাই বন্ধুর কেমন-কেমন বোধ হ'তে লাগল। যদিও তীর্থ-যাত্রী হিসেবে তার সুনাম আছে যথেষ্ট-_বহুবার বহু ছুর্গম তীর্থে সে গিয়েছে, বৃদ্ধা, যুবতী শিশুদের নিয়ে, এবং অক্ষত দেহে সুস্থ শরীরে আবার তাদের ফিরিয়ে এনেছে; তবুও এবার কিন্তু তারও সাহস হলো না। ফলে আমার ডাক পড়লো

তাই হঠাৎ সেদিন ভোর (বল! বন্ধু এসে বললে, আমরা আজ চন্দ্রনাথ যাচ্ছি__তুইও চল আমাদের সঙ্গে

চন্দ্রনাথ! জায়গাটার নাম শুনে মন ছাৎ ক'রে উঠলো। জঙ্গে- সঙ্গে একটা! দীর্ঘনিশ্বাস চেপে নিয়ে বল্প,ম, যাবে!

মনে পড়লো, দশ বছর আগে আমার বাবা গিয়েছিলেন সেইখানে এবং সেই হয়েছিল তাঁর শেষ তীর্থ দর্শন! তাই, যে-তীর্ঘের সন্ধে

দুরের পিয়াসী

তার শেষস্থতি 'জড়িয়ে আছে, তাকে একবার চাক্ষুষ দেখবার জন্য অন্তর ব্যাকুল হয়ে উঠলে!

ম্যাটিকুলেশন পাশ করে তখন আমি অনেকদিন বেকার বসেছিলুম খুড়োর গলগ্রহ হয়ে।

বলাবাহুল্য সংসারে আমার বিশেষ কোন বন্ধন ছিল না ম! শৈশবেই মারা গিয়েছিলেন | তাছাড়া যারা শ্নেহ দিয়ে, ভালবাস! দিয়ে, মানুষের মনে একটা অধিকার বিস্তার করে-যাদদের ছেড়ে যেতে গেলে অন্ততঃ মুহূর্তের জন্যও চোখ ছলছলিয়ে ওঠে, পা! চলতে গিয়েও অন্য- মনন্কভাবে একবার থেমে যায়__তারা কেউই ছিল ন!। তাই সেদিন এক কথাতেই বেরিয়ে পড়লুম বন্ধুর সঙ্গে

প্রভাতের কাচা রোদে গাছপালা ঝলমলিয়ে উঠলো; তারা যেন হাসিমুখে হাত নাড়তে নাড়তে আমাদের বিদায় দিলে দূরের গ্রামগুলি__ ছোট ছোট চালাঘর, সবুজ ক্ষেত, বাশের ঝাড়, শামলা কলমি ঢাকা পুকুর, বাঁশের পুল, সব যেন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে আমাদের পানে তাকিয়ে রইল।

লৌহে লৌহ ঘর্ষণ ক'রে, উন্মত্ত কোলাহলে নিস্তব্ধ দুপুরকে বিদীর্ণ ক'রে, শান্ত গ্রামগুলি সচকিত করতে করতে আমাদের রেলগাড়ী ছুটে চললো!

লাইনের ছু'ধারে একঘেয়ে দৃশ্ট ! যেন চোখের ওপর কে ছুটো৷ সবুজ লাইন টেনে চলেছে।

থার্ড ক্লাসের যাত্রী আমরা, তায় মেলার অসহা ভীড়! বাপরে, প্রাণ যায়! আর পারি না। মন ক্লান্ত হ'য়ে ওঠে! দেহ ব্যথায় টনটন করতে থাকে ! বার বার কেবল ঘড়ি দেখি। «

্‌

সথদুরের পিয়াসী

দুপুর নাগাত গাড়ী গিয়ে থামল গোয়ালন্দ ট্টেশনে। আমর! নামলুম সেখানে মোটে এইটুকু পথ এসেছি, এতক্ষণে দেড়শো৷ মাইল ? আর একি ষ্টেশন! না আছে কোন ঘর, না আছে কোন পাক! রযাট্ফর্্ন__ শুধু এলোজমির ওপর দু'একটা দরমা-ঘের! কুটুরী।

যাই হোক্‌। সেখান থেকে কুলির মাথায় মালপত্র চাপিয়ে আমরা স্টিমারে গিয়ে উঠলুম।

এত বড় ষ্টিমার আমি এর আগে কখনো দেখিনি। কত লোক, যেন মেলা বসেছে সেখানে ওপরে নীচে যেদিকে চাই, শুধু যাত্রী, অসংখ্য যাআী, নান! দেশ থেকে তারা এসেছে-_কেউ আট ঘণ্টা আগে, কেউ তার আগের দিন রাত্রে, কেউব৷ ছুদদিনের পথ হেটে এসে বসে আছে শুনলুম। তাই যে যেখানে পেরেছে শুয়ে বসে দীড়িয়ে নিজ নিজ জায়গা ক'রে নিয়েছে। পথে জায়গা নেই, সিঁড়িতে জায়গা নেই, বারান্দায় জায়গা নেই। অথচ আমর! পাঁচটা প্রাণী, যাই কোথায়? এদিকে এই স্টিমার ফেল করলে আবার কাল এই সময় ছাড়া স্িমার নেই। আমাদের সঙ্গে বিছানা, ট্রাঙ্ক প্রভৃতি মালও অনেকগুলি !

নিরুপায় হয়ে শেষে কুলিকে মোটা বকশিসের লোভ দেখালুম। তখন সে ঠেলে-ঠুলে লোকের জিনিসপত্র মাড়িয়ে সরিয়ে আমাদের ওপরে নিয়ে গেল এবং বাবুচিখানার পাশে একট, জায়গা করে দিলে। কোন রকমে বিছানা বিছিয়ে ঠেসাঠেসি করে আমরা পীচজনে গিয়ে সেখানে বসে পড়লুম।

জামার বোতাম খুলে একটু স্বস্তির নিঃশ্বীস ফেলছি-_এমন সময় বন্ধুর মা “ম্যাগো” বলে তাড়াতাড়ি বিছানার একটা কোণ সরিয়ে নিলেন।

চেয়ে দেখলুম, আমাদের বিছানার জঙ্গে বিছানা লাগিয়ে গুয়ে

স্থদুরের পিয়াসী

আছেন লুঙ্গিপর! দাড়িওয়াল! এক ভদ্রলোক এসব দিকে মায়ের চোখ ভারী সাফ. !

উঃ, কোথায় নিয়ে এলি! বলে অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে তিনি নাকে কাপড় চাপ দিলেন।

বাবুচিখানার বিজাতীয় গন্ধে তখন চারিদিক আমোর্দিত হয়ে উঠেছে সমস্ত সকাল অনাহারের পর সে গদ্ধ নাসিকায় প্রবেশ করতেই রসনা সরস হ'য়ে উঠলো

কিছুক্ষণ পরে বাঁশী বাজিয়ে ষ্টীমার ছেড়ে দিল।

মধ্যান্ছের প্রথর রোদে ঢেউগুলি ঝলমল করতে লাগল ! দেখতে দেখতে আমাদের স্টিমার অনেক দূরে গিয়ে পড়লো আমরা একবারে এসে পড়লুম মাঝ দরিয়ায়! জল-_শুধু জল চারিদিকে__নীল স্বচ্ছ জল, অগণিত ঢেউ তুলে আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকতে লাগল। কেবল দূরে-_অতি দুরে দু'একটা গাছের মাথা, আর চালাঘর গ্রামের আভাষ দেয়। তারা যেন সলজ্ঞ বধূর মত ঘোমটার ফাক দিয়ে একবার উকি মেরেই আবার অবগুঞনের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফেলে

তারপর কোথায় গেল মাটী! কোথায় মিলিয়ে গেল তার শ্থামশ্ী। ! আর দেখতে পাই না, মনটা যেন কেমন একরকম হয়ে যায়।

আবার কিছুক্ষণ পরে মন লাফিয়ে ওঠে, আরে, ওইতে।__ডাঙ্গ। !

হঠাৎ দেখা যায় একটা চর কুমীরের মত জলের মাঝে পিঠ ভাসিয়ে যেন রোদ পোয়াচ্ছে। তার ওপর ছোট ছোট চালাঘর, গাছপালা, জেলেদের জাল, দু'একটা ছোট ডিজি-_ঠিক যেন ছবির মত মনে হয়।

ভিমার চলেছে

স্থদূরের পিয়াসী

সথ্ধ্য পশ্চিমে ঢলে পড়লো আমরা এসে পড়লুম একেবায়ে পল্মার বুকে ! দেখলুম' আকাশের সঙ্গে জলের মিলন ! মনে হ'লো যেন অনস্তের সঙ্গে অনন্তের প্রেমালিজন ! সে কি মহান দৃশ্া, সেকি অদ্ভুত শোভা! ! চোখ জুড়িয়ে গেল, মন ভরে উঠলো!

বন্ধুর মুখের দিকে চেয়ে দেখলুম সে যেন দু'চোখ দিয়ে গুষে নিচ্ছে সেই অপূর্ব রূপমাধুরী। বৌদির মুখের দিকে তাকালুম, সেখানেও একটা স্বপ্নের ছবি !

মাসীমা তখন পান সাজছেন আর মার সঙ্গে গল্প করছেন। তার একটু এজারজোর” কথ! বলা অভ্যাস এবং বলবার সময় তিনি কণ্ঠম্বর, হাত, মুখ, চোখ প্রভৃতির ভঙ্গিমা! এমনভাবে করেন যেন মনে হয় তার অভিনয় দেখছি।

মাসীমা৷ তখন তার পাশের বাড়ীর মেয়েটির কথ! বলছিলেন- ছু'ড়ি এমন ঢলানি যে, পুরুষ দেখেছে কি অমনি ঢলে পড়বে তার গায়ে

বন্ধু তাদের ডেকে বললেন, দেখ দেখ চেয়ে দেখ, কি সুন্দর দৃশ্য ! চলন! বাইরে গিয়ে দাড়াই !

মাসীম। গলায় একটা! অদ্ভুত রকমের স্থুর টেনে এনে বললেন, না বাববা মরছি কোমরের ব্যথায়, কে আবার উঠে দাড়াবে?

মায়ের অবস্থাও সেইরকম তিনি তখন পাছ্‌ণ্টী ছড়িয়ে দিয়ে দিব্যি গ! ঢেলে দিয়েছেন বিছানায়। কাজেই তাঁরা কেউই উঠলেন না, আবার নিজেদের আলোচনায় মগ্ন হলেন।

আমি, বন্ধু বৌদিদি__-তিনজনে উঠে এসে দীড়ালুম ফাষ্ট ক্লাশের বারান্দায় কারো মুখে কোন কথা নেই__আমরা৷ যেন ডুবে গেছি কোন সৌনর্ধ্ের অন্তরে, রূপের অতল গহ্বরে একটা সীমাহীন

নীল শূন্তার মধ্যে দিয়ে আমরা ভেসে চলেছি পথহারা পাখীর মত। কোথাও কোন অবকাশ নেই_-আকাশে আর জলে সব একাকার হয়ে গেছে। এই সেই পদ্মা! রূপসী পক্মা! সর্বনাশী পদ্মা ! মন বিস্ময়ে আনন্দে স্তব্ধ হ'য়ে গেল

আমাদের চোখের সামনে আকাশকে শেষ চুম্বন ক'রে স্্য অন্ত গেল, বুঝি তাই লজ্জায় তার গাল লাল হয়ে উঠলো জন্ধ্যা এলো আকাশে তারার ফুল ছড়িয়ে, সমস্ত প্রকৃতিকে ঘুম পাড়িয়ে, তাদের কালো স্বাচলের আবরণে ঢেকে রেখে আমাদের চোখের সামনে একটা মসীময় ষবনিকা এসে পড়লো হুর্তেদ্য নিশ্ছিদ্র !

কোথায় চলেছি আমরা? দিকৃচিহবিহীন অন্ধকারের রাজত্বে, অথবা চিরস্থির কোন অন্ধ অস্তঃপুরে? ষ্টিমার ভয়ে আর্তনাদ করে উঠলো সে কান্না কেউ শুনলে না। শুধু অন্ধকারের বুকে গুম্রে গুম্রে মিলিয়ে গেল_ স্বর কোন স্তব্ধতায়।

কিছুক্ষণ পরে ট্রিমার এসে থামলো টাদপুর ঘাটে আরোহীরা চঞ্চল হয়ে উঠলে! এখান থেকে আগাম বেঙ্গল রেলওয়ের ছোট গাড়ীতে চেপে তবে যেতে হয় চন্দ্রনাথ-ধামে

আবার ট্রেন, আবার ভীড়, আবার নরনারীর অসন্হ কোলাহল শুনতে শুনতে অন্ধকারের পর অন্ধকার চিরে আমাদের গাড়ী ছুটতে লাগল

ভোর হতেই গাড়ী এসে থামলো সীতাকুণ্ড ষ্টেশনে ! যাত্রীরা চেচিয়ে উঠলে! “জয় বাবা চন্দ্রনাথ ! মা মাসীম! কপালে হাত ঠেকিয়ে নমস্কার করলেন ! নি

ভারী সুন্দর জায়গা ! একদিকে উচু পাহাড় আর একদিকে সমতল

দুরের পিয়াসী

ভূমি, তাতে গাছপালা, বাগান, পুষ্করিণী, অসংখ্য ছোট ছোট চালাঘর বেশীর ভাগ মাটির দেওয়াল খড়ের চাল, কোন-কোনট1 আবার মাটির দোতালায় টিনের চাল। পাক! বাড়ী নেই বললেই হয়। কেবল ষ্টশনের সামনে রাস্তার ধারে একখান! ছোট একতাল! ঘর ছাড়া আমাদের চোখে আর ইটের বাড়ী পড়ল না। শহর থেকে এসে দৃশ্য ভারী চমতকার লাগল !

কিন্ত কোথায় এলুম? যে জনসমুদ্র! যতদূর দেখা যায় কেবল অগণিত নরনারীর মাথা মন হাপিয়ে উঠলো তারপর আবার অধিকাংশ “লাকই অশিক্ষিত__“যমন তাদের বেশ ঠুষা, তেমনি চেহারা, আর সবচেয়ে আশ্চর্ধ্য তাদের ভাষা! ! আমরা তার এক বর্ণও বুঝতে পারি না। চাটগেঁয়ে অদ্ভুত বুলি !

এখন যাই কোথায়? শুনলুম একটা বাড়ীতেও আর লোক নেবার জায়গা নেই। ছু'ঘণ্টা ধরে সমস্ত গ্রামটা ঘুরে এলুম কোথাও একটা ঘর খালি পেলুম না

শিবরাত্রি উপলক্ষে চন্দ্রনাথের মেল অঞ্চলে বিখ্যাত। শোনা গেল এবার তিনলক্ষ যাত্রীর সমাগম হয়েছে। কথাটা খুব সত্যি ! দেখলুম ষ্টেশনের ধারে, রাস্তার দুপাশে, বাড়ীর আনাচে কানাচে তিল ধারণের স্থান নেই। একট! ক'রে উন্ুন জেলে সবাই ভাত চাপিয়ে দিয়েছে আর তারি পাশে পুঁটলি রেখে কাপড় বিছিয়ে যেযার বসে আছে। ভাতের মাড়ে, কাঠ কুটোয়, এটো৷ পাতায় এবং ঝিষ্টায় সমস্ত জায়গাটা যেন নরক হয়ে উঠেছে।

বন্ধুর মাকে নিয়ে মুস্কিল! তিনি অতিরিক্ত পরিমাণে আচারপরায়ণা তাই কোন রকমে নাকে কাপড় দিয়ে, ম্পর্শদোষ বাচিয়ে বাচিয়ে আমাদের

স্থদুরের পিয়াসী

পিছনে চলতে লাগলেন মাসীমাও কুলীন ব্রাহ্মণের মেয়ে, শুদ্ধাচারিণী বিধবা কিন্তু তিনি তীর্থস্থান বলে সব দোষ ভূলে গিয়ে আমাদের সাঙ্গে সঙ্গে চললেন। ভারী সংস্কারমুক্ত তাঁর মন !

কোথাও কোন আশ্রয় না পেয়ে শেষে একজন পাণ্ডা ঠাকুরকে কিছু বেশী টাকা বকশিন্‌ দিতে রাজী হলুম। তিনি তখন নিজের শোবার তক্তপোৌষটা আমান্দের ছেড়ে দিয়ে স্ত্রী পুত্র নিয়ে সেই ঘরের মাটিতে আশ্রয় নিলেন। এই ভাবে আমাদের একটা আশ্রয় মিললে!

চওড়া দেওয়াল দেওয়া! মাটার ঘর-_বাইরে সরু একফালি ঘেরা-রক যেমন অন্ধকার, তেমনি লাযাতসেতে।

কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ন্নান জলযোগ করবার পর মাসীমা রাধবার জিনিষপত্র নিয়ে সেখানে গেলেন। আলে! থেকে অন্ধকারের মধ্ো গিয়ে প্রথমটা কিছু চোখে দেখা যায় না, তাই একটু পরেই তিনি চমকে উঠলেন। ওরি মধ্যে কম্বল বিছিয়ে শুয়ে আছেন একজোড়া সন্গাসী সন্যাসিনী! আশ্রর্ধ্য, এত অল্প বয়সের সন্ন্যাসী সন্গ্যাসিনী সচরাচর দেখা যায় না! তাই আমর! সবাই কৌতৃহল বশত উকিবুণকি মেরে তাদের একবার দেখে নিলুম।

সন্যাসীর বয়েস একটু বেশী- ছিপছিপে, রোগা রোগ! হাত পা, গালভন্তি দাড়ি, মাথায় মেয়েদের মত চুল টিপি করা, চোখে মুখে যৌবনের দীপ্তি। আর জন্গযাসিনী-_ সে ষেন মেঘে ঢাকা মধ্যাহ্ছের প্রথর স্ুধ্য ! তার আলোক নেই বটে কিন্তু উত্তাপ আছে। বয়েস ঠাওর করা শক্ত পনেরেও হতে পারে আবার পঁচিশও হওয়া আশ্চধ্য নয়।

দুপুরের মধ্যেই মাসীম তাদের সঙ্গে এমন আলাপ জমিয়ে নিলেন সে তাদের জীবনের ইতিহাস আমাদের কারুর জানতে বাকী রইল

সুদুরের পিয়াসী

না তাদের নাকি বিয়ে হয়েছিল অতি শৈশবে, তারপর অপর পাঁচজনের মত পরস্পর পরস্পরকে ভালও বেসেছিল এবং সংসারধর্মমও যথারীতি করেছিল, কিন্তু হঠাৎ একদিন এক মহাপুরুষের বাণী গুনে সংসারের ওপর ধৈরাগ্য জন্মালে!, তারা ছুটে গেল তীর শিশ্যত্ব গ্রহণ করতে কিন্তু তিনি দীক্ষা না দিয়ে আগে বল্লেন অন্তর শুদ্ধ করতে। বারোবছর কঠিন ব্রহ্ষচর্ধ্য অবনমন করে ভারতের সব তীর্থদর্শন করলে তবে তিনি তীদের মন্ত্র দেবেন এইবার সেই বারোবছর পুর্ণ হ'লো!। তাই চন্দ্রনাথদেবকে দর্শন ক'রে তারা উদ্যাপন করতে এসেছে তাদের ব্রত।

কিজানি কে সেই মহাপুরুষ, এদের মধ্যে তিনি কি দেখেছিলেন মনে পড়লো! বুদ্ধদেব, শ্রীচৈতনা, পরমহংসদেবের কথা। তীর সবাই তন্ত্রীকে পরিত্যাগ করেছিলেন সাধনার জন্য কামিনী কাঞ্চন ছিল তাদের মুক্তির পথে বাধা এরা তবে কোন শ্রেণীর সাধক-__-আমি মনে মনে তাই ভাবতে লাগলুম।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

পরের দিন ছিল শিবরাত্রি

সকাল সাতটার সময় উঠে আমরা চন্দ্রনাথ দর্শনে যাত্রা করলুম। বিরাট পাহাড়ের সর্ধ্বোচ্চ শিখরে এই দেবতার মন্দির পাগ্ডাঠাকুর এগিয়ে চললেন আর আমরা তার পিছনে পিছনে আগের রাত্রে বৃষ্টি হয়ে গেছে। পাহাড়ের পথ পিচ্ছিল জলসিক্ত। মায়ের দেহ বেশী ভারী ব্লে তিনি পাগ্ডা ঠাকুরের কাধে ভর দিয়ে ঘুরে ঘুরে উঠতে লাগলেন

দুর্গম পাহাড়-_সরু কর্দমাক্ত পথ বনের মধ্যে দিয়ে উঠে গেছে ওপরে ; মাঝে মাঝে পাথরকাটা সিঁড়ি কোথাও পথ এত সরু যে দুজন এক সঙ্গে চল্‌্তে পারে না * আবার আশে পাশে গভীর খাদ, একটু অন্যমনস্ক হলেই সর্বনাশ ! কোন্‌ অতল গহ্বরে পড়ে মান্ষ যে চূর্ণ বিচুর্ণ হয়ে যাবে তার ঠিক নেই।

কোথাও কঠিন খাড়াই, কোথাও বা গভীর উতরাই। পিপড়ের সারের মত একসঙ্গে দলবেঁধে তিনলক্ষ লোক চলেছে সেই ছুলজ্য্য পাহাড়ের শিখরবাসী দেবতার দুল্লভ চরণ দর্শনে কারো মনে ভয় নেই, দ্বিধা নেই, কি যেন এক নেশায় পেয়েছে তাদের-_তারা যাবেই ! কিন্তু এজোর কিসের? কে বলে ধর্ম নেই, দেবতা নেই? তা যদি না থাকতো কোন্‌ এশ্বধ্যের আশায় আজ এই অসংখ্য নরনারী সকল ক্লেশ তুচ্ছ ক'রে, ঘরের স্থখ শাস্তি বিসঞ্জন দিয়ে এই বিপদসঙ্কুল দুর্গম পাহাড়ের শিখরে আরোহণ করছে? কৈ, অর্থের লোভে, যশের অড়নায়, দেশের মুক্তির কামনায় এই পরাধীন হতভাগ্য জাতকে কেউ কোনদিন

১৩

সদূরের পিয়াসী

এক পাও নড়াতে পারেনি তার ঘর থেকে! যে দৃশ্য চোখে দেখলুম তা জীবনে কখনো ভুলবো না তাই মনে মনে অসংখ্য নমস্কার জানালুম সেই দেবতার চরণে।

সামনে বিরাট চড়াই, অথচ পথ এত সরু যে একটু সস্তর্পণে না গেলেই বিপদ। মাথার ওপর প্রচণ্ড রোদ, তেষ্টায় বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছে-_ তার ওপর শিবরাত্রির উপবাস। ঘাম্তে ঘামৃতে, হাঁপাতে হাপাতে একটি একটি ক'রে সিঁড়ি ভেঙ্গে আমরা উঠতে লাগলুম।

মেয়েদের অবস্থা দেখে আমার ভয় হ'লেো। মা মাসীমার পা ভেঙ্গে আস্ছে, চোখ মুখ লাল হয়ে উঠেছে, মুখ দিয়ে কথা বেরুচ্ছে না; বৌদির অবস্থাও প্রায় সেই রকম। তাঁদের হাত ধরে ধরে ওপরে নিয়ে গিয়ে আমি বসালুম-_বন্ধু তার আড়াই মণ দেহ নিয়ে ততক্ষণে একটা সিঁড়িতে বসে পড়েছে। মাঝে মাঝে সে রবীন্দ্রনাথের কবিত। থেকে দু'একটা লাইন আওড়াচ্ছিল। এমন সময় হঠাৎ ওদিক থেকে বেদি গান ধরলেন, 'ছুগম পথ সগৌরবে, তোমার চরণ চিহ্ন লবে। খুব ভাল লাগলে! সে সময় ওই লাইনগুলো-__মনে যেন আবার আমাদের নতুন বল- সধশার হলো।

আবার “যাত্রা কর, যাত্রা! কর, যাত্রীদল” বলে চল। স্ু+্ হলে]

পাহাড়ের ওপর অসংখ্য তীর্থ ব্যাসকুণ্ড, ভৈরবনাথ, সীতাকুণ্ড, উনকোটি শিব গুরুধ্বনি, ভবানী মন্দির, বিরূপাক্ষ প্রভৃতি | ভীড় ঠেলে একটার পর একটা! দেখে আমরা ক্রমশই ওপরে উঠতে লাগলুম | যেখানে যা অনুষ্ঠান করলে ষোল আন! পুণ্য অঞ্জন করা যায় বলে বিশ্বাস, মা মাসীম! পাল্লা দিয়ে, কখনো! বা অজন্ম ঘুষ দিয়ে, অর্থাৎ প্রচুর দান খয়রাত করে সেটুকু বুঝে নিতে নিতে চললেন

৯৯

সবদূরের পিয়াসী

কপিলাশ্রম থেকে ভানদিকে একটু গেলেই উনকোটি শিব-_অসংখ্য পাথরের নুড়ি বা শিব, অন্ধকার পর্বতগুহার মধ্যে মন্দাকিনীর জলে অনবরত ন্নাত হচ্ছেন তা দর্শনে এবং স্পর্শনে নাকি একেবারে শিবলোক প্রাপ্তি! অতি দুর্গম এই স্থান__-একদিকে অতলম্পর্শ খাদ, অপরদিকে জঙ্গলাবৃত বিরাট পাহাড়, মাঝখানে অতি সন্ধীর্ণ পথ উচু নীচু হয়ে চলে গেছে। এইস্থানে সবচেয়ে পেশীপেশি ভীড়-_গায়ের চামড়া উঠে যায়! মনে হলো! বুঝি সমস্ত যাত্রী সেই এক জায়গায় এসে হঠাৎ থেমে গেছে!

একঘণ্ট1 ধরে সেখানে ঢোকবার বুথা চেষ্টা করে অবশেষে আমরা সেইখান থেকেই নমস্কার করে ফিরলুম। সকলের যেন সর্দিগর্রি হবার জোগাড়, বেরুতে পারলে বাচি। মা ওমাসীমার আক্ষেপের আর শেষ রইল না। তর! বললেন, এখানে মরতে পারাও যে পরম সৌভাগ্য !

এমন সময় হঠাৎ, "গেল গেল' বলে কতকগুলো! লোক এক সঙ্গে চীৎকার করে উঠলো চেয়ে দেখি সামনে এক বীভৎস দৃশ্য__একটা প্রবল ভীড়ের ধাকৃকা লেগে একজন একেবারে পাহাড়ের গায়ে পিশে গেছে আর সঙ্গে সঙ্গে আরও ভীড় এসে পড়ছে তার ওপর সকলেই চেষ্টা করছে তারে টেনে বার করতে কিন্তু কেউই পারছে না।

আমি লাফিয়ে পড়ে দু'হাতে ভীড় ছত্রভঙ্গ করে হিড়হিড় করে টেনে তাকে বাইরে নিয়ে এলুম। একি! এষে সেই সন্যাসিনী !

“সাবাস্‌, সাবাস্‌ ভাই", “বহুৎ আচ্ছা জোয়ান', “পুরুষ বাচ্ছা বটে”, প্রভৃতি অনেক কথাই তখন চারিদিক থেকে আমার কানে ভেসে আসতে লাগল। জন্ন্যাসী ঠাকুর কোথায় ছিল জানি না__হঠাৎ ছুটে এসে আমার চওড়া বুকের ছাতিতে দু'বার হাত ঠুকে বললে--“জিতা রহে। বেটা,

তারপর জঙ্ন্যাসী আমি দু'জনে তাকে ধরাধরি ক'রে দূরে একটা

১৭

স্থদূরের পিয়াসী

গাছের ছায়ায় নিয়ে গিয়ে শুইয়ে হাওয়া করতে লাঁগলুম। সন্স্যাসিনী কিছুক্ষণ পরে আন্তে আস্তে চোখ মেলে চাইল। আমি অবাক হয়ে তার মুখের দিকে চেয়ে রইলুম। এত সুন্দর মুখ, এত মধুর দৃষ্টি আমি জীবনে আর কখনে। দেখিনি !

সন্গ্যাসী বললে, আপনাকে কৃতজ্ঞত। জানাবার ভাষা আমার নেই-_ আপনি আজ একটা মানুষের প্রাণ রক্ষা করলেন।

মনে মনে খুব গর্ব অনুভব করলুম। তারপর আনন্দে আর একবার সন্যাসিনীর মুখের দ্রিকে চাইতেই সেই স্ন্দর মুখ থেকে শুধু একটি কথা বেরিয়ে এলে, আপনি আজ আমার যা অনিষ্ট করলেন অতিবড় শক্রতেও তা করতে পারে ন!

বুবক আমি, একজন যুবতী রমণীকে উদ্ধার করবার পুরস্কার স্বরূপ এখনি হয়ত তার কাছ থেকে কিছু মিষ্ট কথা লাভ করবে! বলে সাগ্রহে তার মুখের দিকে তাকিয়েছিলুম কিন্ত এই একান্ত অপ্রত্যাশিত কথা শুনে নিমেষে আমার তাজা! রক্র ঠাণ্ড। হয়ে গেল। তাই একবার তার মুখের দিকে একবার সন্যাসীর মুখের দিকে চেয়ে সঙ্কোচের সঙ্গে প্রশ্ন করলুম, তার মানে?

সন্যাসিনী সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলে, তার মানে, এইখানে মরবার সৌভাগ্য থেকে আপনি আমায় বঞ্চিত করলেন আমার শিবপ্রাপ্তি হ'লো না, শুধু আপনার এই পরোপকার প্রবৃত্তির জন্যে

আমি একটু ঠা্রার স্থুরে বল্প,ম, ও__এই-?

সন্ন্যাসিনী তার মধুর কম্বরকে বৃথা কঠিন করবার চেষ্টা করে বললে, ও-নয়, আপনার অপরাধ অমাঞজ্জনীয় তা জানেন ?

জানি, কিন্তু না জেনে যা করে ফেলেছি তার জন্যে ক্ষম৷ চাইছি

১৩

দুরের পিয়াসী

ক্ষমা?

আমি বললুম, তবে শাস্তি দিন।

সন্্যাসিনী মৃদু হেসে বললে, বেশ, যতক্ষণ পধ্যস্ত না আমাদের চন্দ্রনাথ দর্শন হয়, ততক্ষণ আপনি আমাদের ছেড়ে পালাতে পারবেন না, এই আপনার শাস্তি।

আমাদের দল ততক্ষণে এগিয়ে গিয়েছিল কিন্তু খুব বেশীদূর যেতে পারেনি। সবাই ক্লাস্ত, কারো পা আর জোরে চলে না। সিঁড়ি ধরে ধরে হামাগুড়ি দিয়ে এক-একজন করে উঠছিল। সবাই তখন চুপ। কারো আর কথাটি পধ্যস্ত কইবার শক্তি ছিল না_শুধু তাদের মুখ দিয়ে ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়ছিল, আর দরদর করে ঘাম ঝরছিল।

সবচেয়ে বিপদ-সঙ্কুল এই পথটা ! প্রায় একমাইল খাড়াই, কোথাও সিঁড়ি আছে, কোথাও নেই-__হাতের কাছে একটা গাছ-পাল! পর্য্যন্ত ধরবার নেই ! চি

সন্ন্যাসী দম্পতীর অবস্থা! খুব কাহিল। তাদের তখন পা ভেঙ্গে আসছে, গ! কাপছে, কোন রকমে টেনে টেনে তাদের হাত ধরে আমি ওপরে তুললুম।

সামনেই বিরূপাক্ষ দেবের মন্দির তার পাশে বিশ্রামের জায়গ! | ঝিরঝির করে ঠাণ্ডা হাওয়৷ বইছে, এখান থেকে দেখা যায় দূরে বঙ্গোপসাগরের নীল জল যেন আকাশের সঙ্গে মিশে রয়েছে। প্রাণ মন জুড়িয়ে গেল, সবাই সেখানে বসে অনেকক্ষণ বিশ্রাম করে নিলুম তারপর দুহাত দিয়ে ভীড় ঠেলে আমি তার্দের বিরূপাক্ষ দর্শন করিয়ে নিয়ে এলুম।

ভীড়ের চাপে আমার জাম ছি'ড়ে গেল, দেওয়ালে হাত ছড়ে গিয়ে

পিং

১৪

স্থ্দূরের পিয়াসী

রক্ত পড়তে লাগল সন্াসিনী অত্যন্ত অপ্রস্তত হয়ে বললে, দেখুন ত, আমাদের জন্যে আপনার কিরকম কষ্ট পেতে হ'লো !

আমি একটু হেদে বললুম, শাস্তি আগেই আপনার কাছ থেকে মাথ! পেতে নিয়েছি

সন্ন্যাসিনী তাড়াতাড়ি তার আচল দিয়ে রক্ত মুছিয়ে দিলে। যেন সেবা দিয়ে সে আমার সমস্ত কষ্ট লাঘব করতে চায়।

আবার সুরু হলো! চলা

ওই চন্দ্রনাথের মন্দির দেখা যাচ্ছে! আর একটা মাত্র চুড়ো__ মাইল-খানেকের কম পথ।

বেলা তখন একটা; আমরা গিয়ে পৌছলুম চন্দ্রনাথ দেবের মন্দিরে। এখন ভিতরে ঢুকি কি করে? মন্দিরের সরু একটু বারান্দা আর তারি মধ্যে দিয়ে সেই লক্ষ লক্ষ যাত্রীর ঢোকবার একমাত্র পথ।

সন্ন্যাসী ঠাকুর ভীড় দেখে আর ভিতরে যেতে চাইল না, বাইরে একটা! গাছের তলায় বসে হাপাতে লাগল জন্নাসিনী কিন্তু কিছুতেই শুনলে না। এবার তাদের ব্রক্ষমচর্ধ্য ব্রতের উদ্যাপন, বাব। চন্দ্রনাথ দর্শন করে তার চরণামৃত পান করলে তবে সফল হবে; বারো বছরের তীর্থ-ভ্রমণ সাথক হবে !

আমি বললুম, ভয় নেই, সতীর পুণ্যে পতির পুণ্য, কাজেই সন্ন্যাসীকে চরণাম্বত এনে খাওয়ালেই পুণ্য যোলআনা হবে।

সন্যাসিনী আমার কথা স্তনে একটা ছোট্ট হাসি চাপতে চাপতে ভীড়ের মধ্যে ঢুকলো আমি রইলুম তার পিছনে, দু'হাতে ভীড় আগলে দেবতা দর্শনের ব্যাকুলতায় তখন তার চোখে মুখে একটা

৯৫

স্থদূরের পিয়াসী

অলৌকিক জ্যোতি '$টে উঠেছে। মুহুর্তের অন্য মে যেন তুলে গেল তার ্রান্তি, ক্লান্তি, ইহকালের সব সুখ-ছুঃখ !

এরকমের ভীড় আমি জীবনে কখনো দেখিনি আমরা সারিবন্দী হয়ে ঈাড়িয়েছিলুম কিন্তু তারি মধ্যে কি ঠেলাঠেলি, পেশাপিশি !

“থাম্‌ থাম, করতে করতেও একট! প্রবল ধাক্কা এসে পড়লে সামনে কে কোথায় যাবে, এক তিল ফাক নেই কোনখানে, ভীড়ের চাপে সন্ন্যাসিনী একবারে আমার বুকের মধ্যে এসে পড়লো

আবার-_আবার একটা ধাক্কা এলো তার ওপর | সন্যািনী এবার দু'হাতে আমার গল! জড়িয়ে ধরে হীপাতে লাগল তার উষ্ণ নিঃশ্বাস আমার গালে পড়তে লাগল, তার বুকের স্পন্দন আমি অন্তরে অন্থভব করতে লাগলুম।

কিছুক্ষণ পরে তীড়টা হঠাৎ সামনের দিকে এগিয়ে গেল। আমি সন্ন্যাসিনীকে তখন এগিয়ে যাবার জন্যে ঠেলতে লাগলুম, আমার পিছনে তখন প্রবল ধাক্কা! কিন্তনে একটুও নড়লো না, চুপ করে আমার বুকের মধ্যে যেন কি খু'জছিল, কি যেন অনুভব কর্ছিল বুঝতে পারলুম না

কয়েক মুহূর্ত পরে সে একটু চমকে উঠে আমার গল! থেকে হাত সরিয়ে নিলে। সঙ্গে সঙ্গে তার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো ঠিক সেই সময় আবার পিছন থেকে আর একটা প্রবল ধাক্কা এলো! আ্োতের মুখে তৃণখণ্ডের মত আমর! একেবারে মন্দিরের মধ্যে গিয়ে পড়লুম |

যাত্রীরা সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো 'জয় বাবা চন্দ্রনাথ” তারপর হুমড়ি থেয়ে পড়ে যে যেদিক থেকে পারলে সেই বন্ুবাঞ্ছিত বিগ্রহটিকে স্পর্শ করতে লাগল। ক্ষয়াঘস। কালে! পাথরের ছোট্ট শিবলিঙ্গটি ফুলবিপত্্রে প্রায় ঢেকে গেছে। সকলের চোখে মুখে কী তৃপ্তির আনন্দ!

১৬

দুরের পিয়াসী

বিস্ময়ের কী রোমাঞ্চকর অন্ৃভৃতি! তাদের কে একপ্রকার অদ্ভুত আকুতি ফুটে উঠলে! সেই ছুল্লভ সৌভাগ্য লাভ করে। তখন যার যা মনের বাসনা ছিল সবাই সব জানালে সেই প্রস্তরীভূত দেবতাকে, সেই পর্বত শিখরবাসী চন্দ্রনাথকে ভক্তের প্রার্থনায় মন্দির কেঁপে উঠলো পর্বতের শিখরে শিখরে সেই ধ্বনি, প্রতিধ্বনিত হ'তে হ'তে মিলিয়ে গেল মহাব্যোমে, অনন্ত শূন্যে, পৃথিবী ছাড়িয়ে দেবলোকে, যেখানে স্ষ্টিস্থিতি প্রলয়ের দেবতা, মহাযোগী শঙ্কর যোগাসনে ধ্যানমগ্র !

ভীড় ঠেলে আমি কোনরকমে সন্যাসিনীর জন্য একটু পথ ক'রে দিয়ে বললুম, শিগগির যান, বাবাকে স্পর্শ ক'রে জীবন ধন্য করুন !

কিন্তু সে তার মধ্যে গেল না, যেন আমার কথা শুনতে পায়নি এইভাবে চুপ ক'রে দীড়িয়ে রইল |

ভিতরে অসম্ভব ভীড়-_গায়ের চামড়া যেন উঠে আমে তাই আমি বিরক্ত হয়ে বললুম, তাড়াতাড়ি করুন, দেখতে পাচ্ছেন না, আমি আর সহা করতে পারছি না।

সন্প্যাসিনী সেইখানে দাড়িয়ে দেবতার উদ্দেশ্টে শুধু দু'হাত জোড় ক'রে কপালে ঠেকাল। তারপর বললে, চলে আস্ন, হয়ে গেছে আমার

বিস্মিত হয়ে বললুম, সে কি! দেবতাকে স্পর্শ করবেন নী চরণামত পান করবেন না?

সন্ন্যাসিনী বললে, না

একটু হেসে আমি বললুম, ন! হয় আমার জন্যে করুন।

তাতে কোন ফল হবে না, কারণ আপনার সঙ্গে আমার মে সম্পক নয়। বলে সে গন্ভীরভাবে বাইরে বেরিয়ে এলো

৯৭

স্থদুরের পিয়ীসী

অপেক্ষাকৃত ফাক! যায়গায় গিয়ে ্াড়িয়ে আমি বললুম, ব্যাপার কি বলুন ত?

কঠিন দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে চেয়ে সন্যাসিনী বললে, ব্যাপার নিশ্চয়ই কিছু আছে তা আপনার মত বুদ্ধিমান যুবকের বোবা! উচিত।

মাথা চুলকে বললুম, দেখুন, আমাকে দেখে যতটা! বুদ্ধিমান মনে করছেন আমি মোটেই ততটা নই।

অর্থাৎ আপনি আমার কাছ থেকে কথাট! বার করে নিতে চান, এই ত? কিন্ত আমি আপনাকে বলবে! না কিছুতেই এই বলে অত্যন্ত বিরক্তিকর দৃষ্টিতে সে আমার দিকে চাইল

কি অপরাধ করলুম জিগ্যেস করতে প্রারি কি?

সন্গ্যাসিনী বললে, আমাকে জিগোস না করে আপনার মনকে করুন।

বিনীতভাবে বললুম, দেখুন আপনার কথাগুলো আপনার চেয়েও রহন্তময় ! যদি স্পষ্ট করে বলেন-_

আমার মুখের কথ! কেড়ে নিয়ে সে বললে, স্পষ্ট করে বলতে গেলে এই বলতে হয় যে, মেয়েমান্ুষের সব কথা পুরুষমান্ুষের কাছে বলতে নেই।

কিন্ত এই তীর্থস্থান দাড়িয়ে আমি যদি আমার কৌতুহল নিবারণের জন্যে সেকথা আপনাকে জিজ্ঞাসা করি তাহ'লে আশা করি আপনার কাছ থেকে সত্যি উত্তর পাবো

এই কথা শুনে জন্ন্যাসিনী কেমন যেন দুর্বল হয়ে পড়লো এবং অত্যন্ত ব্যগ্রভাবে বললে, উত্তর? সেকি! আপনি আমার গোপন কথা জোর করে জানবেন নাকি? রী

৯৮

স্থদুরের পিয়াঁসী

না জোর ক'রে নয়। তবে আমিও আপনার জন্তে কিছু কষ্ট করেছি। এটুকু জানবার অধিকার আমার নিশ্চয়ই আছে। আমি শুধু জানতে চাই যে,এত পরিশ্রম ক'রে, এই পবিত্র দেবমন্দিরে ঢোকবা'র দুর্লত স্থযোগ লাভ করেও তাকে স্পর্শ না করে চলে যাওয়ার মধ্যে কি অর্থ থাকতে পারে?

সন্ন্যাসিনী একটু থেমে বললে, ভেবে দেখলুম আগে মনকে শুদ্ধ করে তবে দেবতাকে স্পর্শ করা উচিত

আমি বললুম, তার মানে? যার পরণে গেরিকবস্ত্র, ললাটে লাল চন্দনের বিন্দু, কণ্ঠে রুদ্রাক্ষের মালা__বাহিরে যার বৈরাগ্য ব্রহ্মচর্য্যের সাধনা, অন্তর কি তার শুদ্ধ নয়?

সন্ন্যাসিনী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বীরে মাথা নীচু ক'রে অপরাধীর মত শুধু বললে, না

না! আমি চমকে উঠলুম। কে যেন একটা চাবুক মারলে আমার পিঠের ওপর। কিসের একটা অজ্ঞাত বিষে সমস্ত মন রি-রি করতে লাগল তিক্ততায় আমার ভরে উঠলে! | বললুম, তবে বাইরে এই শুদ্ধাচারিণীর রূপ দেখিয়ে মান্গুষের অন্তরের শ্রদ্ধা আকর্ষণ কর! ভগ্তামি ছাড়া আর কিছু নয়, কি বলুন?

ভণ্ডামি !

আহত ফনিণীর মত সন্াসিনী অকম্মাৎ মুখ তুলে আমার দিকে চাইলে তার চোঁখে একট তীব্র জালা, মুখে অব্যক্ত বেদনা কিন্তু তখনই কিছু বলতে পারল না, পাতলা ঠোঁটের ছুটি প্রান্ত বার কয়েক কেপে আবার থেমে গেল। যেন অতি কষ্টে সে নিজেকে সংযত করে মিলে

১০

দূরের পিয়াসী

আমি বিস্মিত হ'য়ে তার মুখের দিকে চেয়ে রইলুম। যেন নতুনরূপে আবার তাকে দেখলুম। মনে হলো সে যন ভম্মাচ্ছাদদিত বহি! বাহিরে ক্ফুলিঙ্গ নেই, কিন্তু অন্তরে আছে প্রচণ্ড দাহিকা শক্তি !

সঙ্গে সঙ্গে আবার তার মুখে পূর্ব্বের সরসতা৷ ফিরে এলো তখন মুখ টিপে ঈষৎ হেসে সন্যাসিনী আমায় বললে, আমি ভণ্ড হই আর না হই তাতে আপনার কি এসেযায়! আমি আপনার প্রণয়িনী নই যে নিজের চরিত্রশুদ্ধির কৈফিয়ৎ আপনাকে দিতে আমি বাধ্য থাকবো তবে যদি আমার রূপ দেখে আপনি মজে থাকেন সে সতন্ত্র কথা

এই বলে হাস্যোজ্জল চোখে আর একবার আমার মুখের দিকে চাইলে

আমি এবার অত্যন্ত অপ্রস্তত হয়ে পড়লুম। সেই দারুণ শীতেও আমার কপাল দিয়ে ঘাম ঝরতে লাগল কথার কি উত্তর দেবো ভেবে না পেয়ে ইতস্তত করতে করতে বলে ফেল্লুম, না আপনার অন্নমান মোটেই ঠিক নয়-_তবে কি জানেন, যাকে দেখে আমাদের মনে ভক্তি-অ্ধ আপনি জাগে তাকে আমর! দেখতে চাই পবিভ্ররূপে, দেবী মৃত্তিতে

তাহ'লে আমাকে দেখে আপনার মনে ভক্তি এবং শ্রদ্ধা ছু'ই জেগেছে, কি বলুন?

একট্র হেসে বললুম, মে কথা কি এখনে! বুঝতে পারেন নি?

সন্ন্যাসিনী বললে, আগে বুঝিনি তবে এখন বেশ বুঝতে পারলুম। তাই স্পষ্ট করে আপনাকে বলছি এই বেল! সরে পড়ুন এখান থেকে: আপনার মত লোক আমি ঢের দেখেছি, যারা মুখে ভক্তি শ্রদ্ধা দেখিয়ে রমণীর অন্তরঙ্গ হবার স্থযোগ খোজে

তার কথা শুনে আমার সর্বাঙ্গ জলে উঠলো বললুম, টুঁপ করুন!

২০

সথদুরের পিয়াসী

তুলে যাবেন না যে আপনি নিজে আমায় ডেকে এনেছেন__আমি কুকুরের মত আঁপনার পেছনে পেছনে আসিনি

সন্ন্যাসিনী মৃদু অথচ দৃঢ়কঠে বললে, আর আপনিও তুলে যাবেন ন৷ যে আমার রূপ এবং যৌবন দুই-ই আছে এবং বহু পুরুষ আমার পিছনে পিছনে ঘুরে মরে শুধু একটু কৃপাদৃষ্টি লাভ করবার জন্যে

আমি আমার প্রশস্ত বক্ষকে আর একটু স্ফীত ক'রে বললুম, কিন্ত পুরুষের জাত আলাদা!

মুচকি হেসে সন্ন্যাসিনী বললে, পুরুষের মধ্যে ষে কোন জাতিভেদ আছে সেকথা আমি বিশ্বাস করি না। আমি বৃদ্ধকে দেখেছি, যুবককে দেখেছি, স্কুলের বালককে পধ্যন্ত দেখেছি-বলতে আপনাকে লজ্জা করে যে এরা সবাই সমান- পুরুষের মধ্যে কোন বয়সগত পার্থক্য নেই। সবাই নারীর কাছ থেকে চায় এক জিনিষ! এরা বয়েস মানে না, সম্পর্ক মানে না, কিছুই মানে না।

ও, তাহলে দেখছি আমার অন্ুমানই ঠিক, আপনি “বহুজনপ্রিয়া”

বহু জনকে জানি না, তবে আপাতত একজনকে দেখছি

ছি ছি ছি, আপনার লজ্জা করলে! না৷ একবারও কথাগুলোকে মুখে উচ্চারণ করতে?

কে রহন্তের সুর টেনে এনে সন্ন্যাসিনী বললে,সন্ন্যাসীদের যদি দ্ব্ণা বা লঙ্জ! থাকতো তাহ'লে কি তারা ঘর ছেড়ে পথে পথে বেড়াতে পারতো ?

আমি তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললুম, সন্ন্যাসীদের সঙ্গে নিজের নাম করে আর সন্যাসীনামের অপমান করবেন না।

তাই নাকি? আপনার ভক্তি দখছি খুব ! তবে জানতে পারি কি সেটা কার ওপর বেশী-_সক্ন্যাসী ন! সন্ন্যাসিনীর ?

২১

আমি বললুম, আপনি যদি পুরুষ হতেন এই মুহুর্তে আপনার ওই ভগ্ামি_ গেরুয়া বসন টেনে ছি'ড়ে পদ্মার জলে ভাসিয়ে দিতুম। যে বেশ বুদ্ধ, চৈতন্য, মীরাবাঈ ধারণ করে একদিন সহম্র সহস্র উক্তের হৃদয়বল্লভ হয়েছিলেন তার অপমান আমি কিছুতেই এমনভাবে হতে দিতুম না। এই বলে আমি সঙ্গীদের খোজ করবার জন্যে সে স্থান ত্যাগ করে ভীড়ের দিকে অগ্রসর হলুম।

পিছনদিক থেকে জন্রযাসিনী ভাকল, শুনুন

মুখে চোখে তার অস্বাভাবিক গান্তীরধ্য। আমি কাছে যেতেই সে ধীর অথচ দৃঢ়কণ্ঠে বললে, আপনি এখন যা আমার জামনে বললেন অন্য কেউ হলে তা সহা করতুম না, তবে নেহাৎ আপনি আজ আমার প্রাণ রক্ষা করেছেন তাই আগ্রানাকে কিছু বললুম না

আমি বললুম, তাই বললেন না, না বলবার মত কিছু নেই বলে চেপে গেলেন?

হয়ত বলবার কিছু নেই সত্যি, কারণ যার অপমানের কথা চিন্তা করে আপনি এত উত্তেজিত হচ্ছেন তার কারণ আপনি নিজে।

আমি !

রাজেন্দ্রাণীর মত ঘাড় বেঁকিয়ে সন্গযাসিনী বললে, হ্যা আপনি বারো বছর ধরে আমি যে গেরুয়ার সম্মান রেখে এসেছি, তাকে আজ কলুষিত করেছেন আপনি?

মিথ্যে কথা

মিথ্যে কথা৷ আমার না৷ আপনার ? বাব! চন্দ্রনাথের মন্দিরের সামনে দাড়িয়ে তাকে স্পর্শ করে আপনি বলুন দেখি যে আমাকে বক্ষে আশ্রয়

৮৬২

স্থদূরের পিয়াসী

দেবার সময় আপনার মনে কোন কামন! জাগেনি ! সত্যি বলুন, চুপ করে রইলেন কেন? তার কণ্স্বর কাপতে লাগল।

তীর্থস্থানের মাহাত্ম্য আমি অনেক শুনেছি! দেবতাদের কখনো চোখে দেখিনি তবে তাদের বু আলৌকিক কাহিনী আমার কানে এসেছে। কিন্তু একি! জন্যাসিনীর মুখ থেকে এই কথা শোনবার পরই আমার মনে হলো! যেন মন্দিরের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসে বাবা চন্দ্রনাথ দাড়ালেন আমার সামনে তাঁর পরণে বাঘছাল, সর্বাঙ্গ ভন্মাচ্ছাদিত, হাতে ত্রিশল। ত্রিলোচন-ত্রিলোকের আনন্দ যেন ঝরে পড়ছে তার বদন মণ্ডল থেকে আমি দু'হাত তুলে তাঁকে নমস্কার করলুম। আমার সারাদেহ রোমাঞ্চিত হয়ে উঠলো

এমন সময় অন্যাসিনী আবার বললে, সত্যি বলুন, দেবতার সামনে মিথ্যা বলবেন না ?

আমি লজ্জাবিজড়িত কণ্ঠে বললুম, হ্যা। আপনি বক্ষে আশ্রয় নেবার সঙ্গে সঙ্গে আমার বুকের মাঝে ঝড় উঠেছিল, আমার শিরায় উপশিরায় রক্ত উন্মত্ত তাগুবে নৃত্য করতে স্থুরু করেছিল সত্যি

সন্ন্যাসিনী অধীরভাবে বলে উঠলো, তবে আমি যদি বলি যে আপনার সেই কলুষিত অন্তরের স্পর্শে আমার মনের পবিত্রতা নষ্ট হয়েছে, তবে সেকি আমার দোষ না আমার গেরুয়ার দোষ?

আমি একথার কি উত্তর দেবো ভেবে পেলুম না, তাড়াতাড়ি সেখান থেকে পালিয়ে ভীড়ের মধ্যে ঢুকে পড়লুম।

সন্প্যাসিনী স্থির হয়ে সেখানে দাড়িয়ে রইল। সর্বস্ব হারিয়ে গেলে লোকের মুখ চোখের যেমন চেহারা হয় তাকে তখন ঠিক সেইরকম দেখাচ্ছিল।

২৩

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

ক্রমশই নীচের দিকে নামতে লাগলুম

পাহাড়ের চড়াই যেমন কষ্টকর উতরাই তেমনি সহজ। আমি আমার দলকে খুঁজতে খু'জতে চললুম

চোখের সামনে দিয়ে কত লোক যাচ্ছে আসছে কিন্তু আমি কাউকেই যেন দেখতে পাচ্ছিলুম না! কারণ আমার মন তখন কি চিন্তা করছিল ত৷ জানি না।

বু দূর নেমে যাবার পর হঠাৎ দীড়িয়ে পড়লুম! আমার মনে হ'লো, তাইত, এর জন্যে দায়ী আমি- সন্ন্যাসিনীকে তবে কেন মিছিমিছি ভৎ্সনা করলুম। আমারই কামনার কলুষস্পর্শে, তার অন্তর অশুচি হয়েছে। শুদ্ধাচারিণী দেবীপ্রতিমার গায়ে আমি-ই কাদা ছু'ঁড়েছি। দোষ আমার একজনকে আশ্রয় দিতে গিয়ে, ভীড়ের নিষ্পেষণ থেকে রক্ষা করতে গিয়ে, আমি স্থযোগ নিয়েছি তার পুষ্পকোমল শুচিশুভ্র দেহ-দেউলের

আমার মনে অন্থশোচনা হতে লাগল কিরলুম। জন্সাসিনীর কাহে গিয়ে মাপ চাইতে হবে।

কিন্তু কোথায় গেল জন্যাসিনী?

ওপরে গিয়ে তাকে আর খুঁজে পেলুম না_যেখানে তাকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে আমি চলে এসেছিলুম তার আশেপাশে চারিদিকে তন্ন তন্ন করে খুঁজলুম। জন্ন্যাসী যেখানে বসেছিল সেখানে গিয়েও তাকে আর দেখতে পেলুম না | নিশ্চয় তবে পিছনের রাস্তা দিয়ে

পট

২৪

সদূরের পিয়াসী

নেমে গেছে। সেই রাস্তাটা খুব সোজ! এবং অপেক্ষাকৃত নির্জন-_অতি সহজেই সেখান দিয়ে নীচে নামা যায়।

এই ভেবে আমি /আর মুহূর্তমাত্র বিলম্ব না করে সেই রাস্তাটা ধরলুম | হয়ত এখনও তাড়তাডি গেলে পথে তাদের সঙ্গে দেখা হতে পারে !

কিস্তু একটা উতরাই শেষ করে যেই মোড় ফিরেছি আমাদের দলের সঙ্গে আমার দেখ হয়ে গেল। বন্ধু চলেছে সকলের আগে আর পিছনে পিছনে মা, মাসীমা বৌদি। আমাকে দেখে বৌদি একটু ফিক করে হাসলেন। সে হাসির অর্থ এমনি সুস্পষ্ট যে আমি সঙ্গে সঙ্গে তার একট৷ জবাবদিহি করতে যাচ্ছিলুম কিন্তু কিছু বলবার আগেই বৌদি বলে ফেললেন মৃদু অনুচ্চস্বরে, কি ঠাকুরপো, সন্ন্যাপিনী বুঝি তাড়িয়ে দিলে?

ঘোরতর আপত্তি করে আমি বললুম, তাড়িয়ে দেবে? এমন সাধ্য কার? শম্মা ওরকম ঢের ঢের মেয়ে দেখেছে।

বৌদি বললেন, তাড়িয়ে দেয়নি ! তবে সন্ন্যাসিনী বুঝি হারিয়ে গেছে, ভীড়ে তাকে খুঁজে পাচ্ছে! না?

আমি বললুম, মিথ্যে কথা, কখখনে। তা নয়! সন্যাসিনীকে খোঁজবার জন্তে আমার বয়ে গেছে।

বৌদি বললেন, তা নাহলে হঠাৎ আমাদের কথা মনে পড়বে কেন? আচ্ছা ঠাকুরপো, তোমার কি এতটুকু কাগুজ্ঞান নেই? একটা মেয়ে- মানুষ দেখলে আমাদের সকলের কথা একেবারে ভূলে গেলে ! এই ভীড়ে আমরা মলুম কি বাচলুম একবারও খবর নিলে না? আশ্চধ্য ! অথচ তোমারই ভরসায় আমরা এলুম এই দুর্গম তীর্থে।

আমি একটু অপ্রস্তত হয়ে পড়লুম। তারপর মৃদু কে বললুম-_

ত্৫

দুর্গম তীর্থ একে বলছেন-__তাহ*লে বড় বড় তীর্থ করবেন কি ক'রে-_ কেদারনাথ, বদরীনাথ, অমরনাথ? তাদের কাছে ছেলেমানুষ-_ তাছাড়া ছু? দুটো ষণ্ডা ষণ্ডা লোক যখন আপনাদের সঙ্গে রয়েছে তখন আমার আর কি প্রয়োজন ! সেইজন্যে যাঁদের সত্যি কোন সহায় সম্পদ নেই তাদের দেখছিলুম।

শ্লেষাতককণে বেদি বললেন, যাদের সত্যি সত্যি কোন সহায় সম্পদ নেই তাদের দেখছিলেন, না কেবল সন্ন্যাসিনীকে দেখছিলেন? মুছু হাসিতে তীর মুখ উজ্জল হয়ে উঠলো তারপর একটু থেমে তিনি বললেন, এই তোমার সেই সন্যাসিনীকে ওপরে দেখে এলুম

আমি বৌদির সঙ্গে আর ছু'চারটে বাজে কথা বলতে বলতে হঠাৎ জামার বুক পকেটে হাত দিয়ে বললুম, ওই যাঁ, আমার ফাউনটেন পেনটা কোথায় পড়ে গেছে বেদি আপনারা ততক্ষণ এগোন-_ আমি খুঁজে দেখি কোথায় গেল। এই বলে আমি আবার ওপরের দিকে উঠতে লাগলুম

বৌদি খিল খিল করে হেসে উঠলেন ছেলেমাহুষের মত।

আমি বললুম, ভাসছেন যে?

হাসি চাপতে চাপতে বৌদি বললেন, কলম খুঁজতে যাচ্ছো, না সন্যাসিনীকে খুঁজতে যাচ্ছো--সত্যি করে বলতো ঠাকুরপে! ?

যান, আপনি ভারী দুষ্ট) এই বলে আমি তাড়াতাড়ি সেখান থেকে পালালুম |

ওপরে গিয়ে আবার সন্ন্যাসিনীকে খুঁজতে লাগলুম কিন্তু কোথাও তাদের দেখতে পেলুম না। তখন মনে হলো! বৌদি রসিকতা করলেন নাত? যাই হোক ভগ্র মনোরথ হয়ে আবার আমি একাকী নায়তে সুরু

২৬

করলুম সেই নির্জন পথটা দিয়ে বাঁধা পথে চলা আমার স্বভাব নয়-_ নতুন পথ আবিষ্কার করার দিকে সর্বদা আমার ঝৌঁক। তাছাড়৷ তখন বেশী তাড়াতাড়ি নামবার “চষ্টা করছিলুম, যদি সন্্যাসিনীকে কোন রকমে নীচে নামবার আগে ধরতে পারি তাই নামতে নামতে যেদিকে একটু পায়ে চল! পথের ইঙ্গিত পাই (সেইদিকে এগিয়ে গিয়ে পথটা সংক্ষেপ করছিলুম |

এইভাবে একটা! ছুটো৷ ছাঁট উততরাই সবে পেরিয়েছি এমন সময় দেখি সেই সন্্যাসীঠাকুর একটা বেলগাছ্ছের ডাল থেকে পাতা! ছিড়ছেন

আমি বললুম, ব্যাপার কি সন্রাসীঠাকুর, এমন সময় বেলপাতা কি হবে?

তিনি বললেন, সন্ন্যাসিনীর দরকার

সন্যাসিনীর দরকার ! তিনি কোথায়?

সন্ন্যাসী আঙ্গুল দিয়ে দূরে দেখিয়ে বললেন, ওই--ওদিকে আছে__ একটা প্রায়শ্চিত্তের জোগাঁড়ে এখন বান্ত__-অবশা পাণ্ড ঠাকুরও আছেন সেখানে_ যান না।

প্রায়শ্চিত্তের কথ! শুনে আমার মনটা কেমন হয়ে গেল। কিসের জন্য এই প্রায়শ্চিত্ত? এই কথা ভাবতে ভাবতে আমি অগ্রসর হতে লাগলুম।

সঙ্কীর্ণ একটা পথ নেমে গেছে নীচে ঝর্ণার দিকে তাই ধরে খানিকটা যাবার পর দেখলুম আর একটা পথ বাঁদিক থেকে বেরিয়ে এসে পাহাড়ের একটা গহ্বরের মধ্যে মিশেছে সেইখানে বসে আছে সন্যাসিনী অপূর্ব্ব তার মূর্তি, স্যন্নাতা, সিক্তবসনা, পিঠের ওপর ভিজে চুলের রাশ _-কপালে একটী ছোট্র সিন্দুরের বিন্দু। পাহাড়ের মধ্যে সেই নির্জন বনাস্তরালে তাকে ঠিক বনদেবীর মত দেখাচ্ছিল !

দুরের পিয়াসী

পাণ্ডাঠাকুর পূজার আয়োজনে অন্যত্র ব্যস্ত। লোকজন বড় একটা কেউ ছিল না সেদিকে শুধু সেখান থেকে দেখা যায় দূরে পাহাড়ের গ! বেয়ে পি'পড়ের সারির মত লোক চলেছে আর তাদের মিলিত নিঃশ্বাস থেকে অবিরত ধ্বনিত হচ্ছে মৌচাকের মত মৃদু গুঞ্জরণ !

আমাকে সেইদিকে আসতে দেখে সে তাড়াতাড়ি উঠে দাড়ালো তার মুখে চোখে একটা ভীত সন্ধস্ত ভাব। এগিয়ে এসে সে আমাকে বললে, আপনি এখানে এলেন কেন? চলে যান শিগগির

আমি বললুম, আপনার কাছে আমি অপরাধ স্বীকার করতে এসেছি

অপরাধ? নানা, কোন অপরাধ আপনি করেননি ! দোহাই আপনার- আপনি চলে যান এখান 'থেকে, আর আমার সর্বনাশ বাড়াবেন না! এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাকুলতায় তার কণ্ঠন্বর ভেঙ্গে পড়লো

তার এই ভাবাস্তর লক্ষ্য করে বিন্মিত হয়ে গেলুম। তখন আমার মনে যেন আর একটু সাহসের সঞ্চার হলে! তাই তার কাছে আরো! একটু সরে গিয়ে বললুম, আমি বু*তে পেরেছি কি অন্যায় করেছি আপনার প্রতি

আমার এই কথ! শুনে সহস' সন্যাসিনী খিলখিল করে হেসে উঠলে! তারপর বললে, কিচ্ছু বুঝতে পারেন নি, আপনি অন্যায় যা করেছেন তার চেয়ে অনেক বেশী অন্যায় আমার !

তার মুখের দিকে বিস্ফারিত নেত্রে চেয়ে বললুম, বুঝতে পারঠি ন! আপনার কথ! ! ৃ্‌

আমার সঙ্গে আন্মন আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি। এই বলে আ্সামাকে

স্থদুরের পিয়াসী

সে নিয়ে গেল সেই বর্ণার ধারে-_যেখানে স্বচ্ছ জলরাশি সঞ্চিত হ'য়ে পুকুরের মত স্তব্ধ হয়েছিল। সন্স্যাসিনী আমার পাশে এসে দাড়িয়ে আমাকে সেই জলের মধ্যে তাকাতে বললে। দর্পনের'মত আমার চেহারা প্রতিফলিত হ'লে! তার ওপরে | তারপর ধীরে ধীরে সে বললে, দেখেছেন আপনার চেহারা ?--ওই প্রশস্ত বক্ষ, ওই দীর্ঘ ললাট, ওই চিত্ত-বিভ্রান্তকারী দু'্টী কালো চোখ ?

রমণীর মুখ থেকে নিজের দেহের প্রশংসা এই প্রথম আমি শুনলুম। তাই এর উত্তরে তাকে কি বলবো বুঝতে না পেরে শুধু নীরবে তার মুখের দিকে চেয়ে রইলুম |

সন্নযাসিনী তখন ব্ললে, এবার বুঝতে পেরেছেন কার দোষ?

আমি তার একখানি হাত দীরে ধীরে হাতের মধ্যে টেনে নিয়ে বললুম, আর আপনি কি কোনদিন আপনার এই মুখের দিকে চেয়ে দেখেছেন !

কয়েক মুহুর্ত মোহাবিষ্টের মত আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকবার পর হঠাৎ যেন জঅন্ন্যাসিনীর সম্বিত ফিরে এলো। আমার হাতের মধ্যে থেকে তার হাতখানি টেনে ছিনিয়ে নিয়ে বললে, না না না, আমি আর দেখতে চাই না_ আমি ওকথা ঢের শুনেছি_দয়া করে আপনি চলে যান এখান থেকেতা৷ না হ'লে আমার প্রায়শ্চিত্ত করা হবে না

বিস্মিত হ'য়ে ভাবতে লাগলুম, প্রায়শ্চিত্ত করা! হবে না আমার জন্যে, কেন? জন্নাসিনী আমাকে তখনো ইতস্তত করতে দেখে বললে, আপনার ছুণ্টী পায়ে পড়ি আর এখানে ঈীড়াবেন না।

ছি ছি আপনি যেকি বলেন আপনার আদেশই আমার যথেষ্ট ! এই কথা বলতে বলতে আমি তখনি সেখান থেকে চলে এলুম।

২৯

সেদিন কোথা দিয়ে এবং কেমন করে যে এতটা পথ অতিক্রম করে আবার পাণ্ডার বাসায় এসে পৌছেছিলুম তা মনে করতে আজও বিশ্ময় লাগে। | আমাকে বাসায় ফিরতে দেখে বৌদি অকারণ হাসিতে উচ্ছৃসিত হয়ে উঠলেন, কি ঠীকুরপো, ফাউনটেনপেন খুঁজে পেলে ? কেমন জব্দ করেছি মিছিমিছি সন্াসিনীর কথাটা বলে- খুব ছুট করিয়েছি না?

বেদি আমাকে ঠকিয়েছেন মনে করে যতটা হাসতে লাগলেন আমি কিন্তু ততটা ঠকিনি। কারণ আমার মন তখন বলতে লাগল, আমি যা লাভ করেছি তার তুলনা হয় না।

যাই হোক ন্নান ক'রে তখন আহারের আয়োজনে মন দেওয়া গেল। মেয়েদের শিবরাত্রির উপবাস। তীরা জলম্পর্শ করবেন না। ক্রান্ত দেহে তীরা তখন শয্যাগ্রহণ করেছেন। কিন্তু আমাদের তখন ক্ষুধায় নাড়ি জলছে। সকাল সাতটায় বেরিয়েছিলুম আর তখন প্রায় তিনটে বাজে। চাল, ডাল, ঘি, তেল, হাঁড়ি, কাওকুঠা কিনে এনে আমরা তখন নিজেরাই খিচুড়ী চাপিয়ে দিলুম। তারপর নিজেদের হাতের রান্না থেয়ে অবাক হয়ে গেলুম, মনে হ'ল, আহা, যেন অমৃত খাচ্ছি খাওয়া দাওয়া শেষ ক'রেই বন্ধু পাহাড়ের মত গিয়ে পড়লো! বিছানায় এবং সঙ্গে সঙ্গে তার এমন নাসিকাগঞ্জন সুরু হলো যে বাইরে থেকে শুনলে মনে আতঙ্কের স্থষ্টি হয়। মনে হয় যেন ভিতরে কোন দৈত্যের দাপাদাপি চলেছে

দু'টা জোড়া-তক্তপোষের ওপর একদিকে মেয়ের! শুয়েছিল আর এক- দিকে আমরা শুয়েছিলুম। ক্লাপ্তিতে সবাই অবসন্ন, কাজেই বিছানায় গ! ঠেকার সঙ্গে সঙ্গেই সকলে ঘুমিয়ে পড়েছিল। শুধু আমার চোখে ঘুম ছিল না মাঝে মাঝে চমকে উঠছিলুম বাইরের দিকে চেয়ে। ক্ন সেই

৩৩

স্থদূরের পিয়াসী

গেরুয়া রঙের সাড়িটাকে আবার দেখতে পাবো এই ছিল আমার একমাত্র চিন্তা তিনটে, চারটে, এমন কি পাচটাও যখন বেজে গেল, আমি অস্থির হয়ে উঠলুম। বিছানা আমার গায়ে ফুটতে লাগল কি হ'লো তাদের ? এত দেরী হচ্ছে কেন? ভাবতে ভাবতে চুপি চুপি বিছানা থেকে উঠে একবার বাইরে বেরিয়ে এলুম। পাগাঠাকুর তাদের সঙ্গে আছেন এই ছিল আমার ভরসা কাজেই পাণ্ডাঠাকুর তখনো! ফেরেননি শুনে যেন একটু সাত্বনা পেলুম। তবুও একবার বাড়ীর অন্দর মহল বাইরের দিকটা চোখ বুলিয়ে নিলুম কিজানি যদি অন্য কোথাও তারা৷ আয় নিয়ে থাকে? যাত্রীর ভীড় ভয়ানক। লোক গিস্গিস করছে পাণ্া- ঠাকুরের ঘরে, দাওয়ায়, উঠানে

আমি আবার ঘরে এসে শুয়ে পড়লুম। সামনের খোল৷ জানলা দিয়ে বাইরের বহুদূর পধ্যন্ত দেখা যায়। শীতের অপরাহ্ন। তখনই যেন আকাশে সন্ধ্যার ছোয়াচ লেগেছিল-_দূরের গাছপালা, পাহাড়ের মাথ| সব অস্পষ্ট হ'য়ে আসছিল। আমি সেইদিকে তাকিয়ে চুপ করে শুয়েছিলুম।

এমনি সমন হঠাৎ আমার নজর পড়লো দূরে পাগ্ডাঠাকুরের ওপর তিনি আসছেন হাতে একটা পুঁটুলি নিয়ে নতুন গামছা, কাপড়, আরে! কতকি রয়েছে তার মধ্যে আর কয়েকটি যজমান তার পিছনে

নিঃশব্দে আমি উঠে বসলুম! একটা অজানা পুলকে আমার সমস্ত দেহ রোমাঞ্চিত হ'য়ে উঠলো রাস্তা থেকে বাড়ী আসবার মাঝে একট মাটির ড্রেন ছিল-_তার ওপর তালকা$, বাশ মাটি দিয়ে নতুন সাকো তৈরী করা হয়েছিল। পাগ্ডাঠাকুর এই সাঁকোটা পার হয়ে সদরে পা দিলেন। তারপর সেখানকার সমস্ত যজমানদের কুশল প্রশ্ন করতে করতে

৩১

দূরের পিয়াসী

ভিতরে ঢুকলেন আমি তাঁর পিছনে সাগ্রহে চেয়ে রইলুম। একটি, ছু'টি ক'রে কতকগুলি নরনারী তাঁর পশ্চাদ্গসরণ করলে কিন্ত সন্ন্যাসী সন্গ্যাসিনী কৈ? তারা এলো না! আমি জানল! দিয়ে একটু ভালে করে বাইরের দিকটা চেয়ে দেখলুম। তারপর দ্রতপদে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে পাগ্ডাঠাকুরের কাছে দীড়ালুম |

কিন্ত প্রথমেই তাঁকে জন্যাসিনীর কথাট! জিগ্যেন করতে কেমন যেন সঙ্কোচ বোধ হতে লাগল। তাই অনাবশ্তক কতকগুলি প্রশ্ন আগে তাকে জিগ্যেস করলুম। যথা, এবছরে কত যাত্রীর সমাগম হয়েছে, ফি বছরে এই রকম হয় কিনা, পাগ্াদের ঘরে স্থান সঙ্কুলান না হলে যাত্রীরা তখন কোথায় থাকে, বাইরে যারা থাকে শীতে তাদের কষ্ট হয় কি না' প্রভৃতি

পাগ্ডাঠাকুর পরম ধৈর্য্ের সঙ্গে আমার এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে লাগলেন

তারপর যেমন বললুম, যাত্রীদের ভীড়ে আপনাদের এই কটা দিন খুব কষ্ট হয়, কি বলুন ?

সঙ্গে সঙ্গে তিনি জীব কেটে বলে উঠলেন, না__না-_কষ্ট আর কি! আপনার দয়া করে এসে বরং আমার্দের আশ্রয়েই কত কষ্ট পান-_ আপনারা কত বড় লোক-_এই মাটির ঘরে কি থাকা আপনাদের শোভা পায়?

আমি তাড়াতাড়ি তার এই উচ্ছ্বাসট! চাপা দিতে দিতে বলে ফেললুম- আচ্ছা যাত্রীর যেমন ভীড়, ০০০ হয় না, কি বলেন?

এতক্ষণ পরে আমি যেন তাঁর মনের কথা টেনে বলজ্গুম"। তিনি

৩২

স্থদূরের পিয়াসী

তখন সথেদে আগেকার দিনের চেয়ে আজকাল পাওনা যে কি রকম কমে গেছে তার ফিরিব্তি দিতে লাগলেন। তাঁর পিতা পিতামহ থেকে শুরু করে সবে বর্তমান নিয়ে পড়েছেন এমন ময় আমি আবার বললুম-_তবে আগে লোকের! তীর্থ করতে এসে অনেকদিন থাকতো, আজকাল মেরে কেটে তিনটে দিন থাকে, তাতেই এই লোকসানটা বেশী হয়, কি বলুন?

তিনি বললেন, তিনদিন থাকলে বাচতুম_-আজই দেখুন না অর্ধেকের বেশী যাত্রী ফিরে গেল।

তাই নাকি ! বলে আমি বিস্ময় প্রকাশ করতে করতে এক সময় প্রশ্ন করলুম, আচ্ছা